ঢাকা: ২০১৯-০২-২০ ২৩:১১

Khan Brothers Group

আওয়ামী লীগের বিজয় এবং নির্বাচনী ইশতেহার

এশিয়ানমেইল২৪.কম

প্রকাশিত : ০৪:৪৭ পিএম, ১২ জানুয়ারি ২০১৯ শনিবার | আপডেট: ০২:৪০ পিএম, ১৫ জানুয়ারি ২০১৯ মঙ্গলবার

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

এম এ খালেক: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যে জয়লাভ করতে পারে, দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান তার পূর্বাভাস দিয়েছিল। কিন্তু জয়ের ব্যবধান এত বেশি হবে তা সম্ভবত কেউই ভাবতে পারেনি। নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে যে ইশতেহার ঘোষণা করা হয়েছিল, তা নানা কারণেই ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

তাদের ইশতেহারে নিকট-অতীতে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অর্জিত সাফল্য তুলে ধরার পাশাপাশি ভবিষ্যতে তারা কী করবেন তার বর্ণনা করা হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের অনেকেই মনে করেন, আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে নতুনত্ব ছিল এবং তা ভোটারদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়। বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং গ্রামকে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত করার যে অঙ্গীকার নির্বাচনী ইশতেহারে করা হয়েছে, তা তরুণ ভোটারদের বিশেষভাবে প্রভাবিত করে।
নির্বাচনী ইশতেহারে আগামী ৫ বছরের মধ্যে ১ কোটি ২৮ লাখ নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। একইসঙ্গে শহরের সুবিধা গ্রামে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে। এটি আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে একটি নতুন উদ্যোগ।

অনেকেই অজ্ঞতাবশত বা উদ্দেশ্যমূলকভাবে এ পরিকল্পনার ভুল ব্যাখ্যা করে বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছেন। তারা বলতে চাইছেন, সরকার গ্রামকে শহরে পরিণত করতে চাইছে। অর্থাৎ আগামীতে গ্রাম আর গ্রাম থাকবে না। গ্রামও শহরের মতো নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়বে। শহুরে যানজট, কোলাহল, বস্তি সমস্যা ইত্যাদি গ্রামে সম্প্রসারিত হবে। বিষয়টি আসলে তেমন কিছু নয়। গ্রাম গ্রামের মতোই থাকবে। শহরে যেসব আধুনিক সুবিধা পাওয়া যায়, গ্রামেও সেসব নিশ্চিত করা হবে। উল্লেখ্য, ইতিমধ্যে এসব সুবিধার অনেকগুলোই গ্রামে পাওয়া যাচ্ছে।
বিশেষ করে যেসব গ্রামে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া সম্ভব হয়েছে, সেখানে তথ্যপ্রযুক্তির সব সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে। ফ্রিজ-টেলিভিশন ইত্যাদি সুবিধা এখন গ্রামে পাওয়া যাচ্ছে। আগামীতে পরিকল্পিতভাবে আরও যেসব সুবিধা শহরে পাওয়া যায়, তা গ্রামে প্রাপ্তি নিশ্চিত করা হবে। শহরকে গ্রামে পরিণত করা বা শহরের সুবিধা গ্রামে নিয়ে যাওয়ার অর্থ গ্রামের চিরকালীন ঐতিহ্যকে নষ্ট করা নয়। সরকারের এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের অর্থনীতিতে গ্রামের অবদান আরও বৃদ্ধি পাবে। গ্রাম ও শহরের মধ্যে যে আর্থ-সামাজিক বৈষম্য তা অনেকটাই কমে আসবে। বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার ৬৯ শতাংশ গ্রামে বাস করে। অবশিষ্ট ৩১ শতাংশ বাস করে শহরে। কিন্তু জাতীয় অর্থনীতিতে শহরের অবদান ৬০ শতাংশ এবং গ্রামের ৪০ শতাংশ।

ইশতেহারে কৃষি যান্ত্রিকায়নের কথা বলা হয়েছে। এটা বর্তমান সময়ের দাবি বলা যেতে পারে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষি খাতের অবদান ও সম্ভাবনা খুবই উজ্জ্বল। ’৭০-এর দশকে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা ছিল সাড়ে ৭ কোটি। তখনও খাদ্যশস্য আমদানি করতে হতো। সেই সময় ৬০ শতাংশ খাদ্যশস্য স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হতো আর অবশিষ্ট ৪০ শতাংশ খাদ্যশস্য আমদানি করতে হতো। বর্তমানে দেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি; কিন্তু খাদ্যশস্য আমদানি করতে হয় না বললেই চলে। এ বছর ৩ কোটি ৬২ লাখ টন খাদ্যশস্য উৎপাদিত হয়েছে। এটা একটি রেকর্ড। গত ৪৭ বছরে দেশে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু তারপরও খাদ্যশস্য উৎপাদনে আমরা প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছি। এ মুহূর্তে আমরা যদি কৃষি যান্ত্রিকায়ন করতে পারি, তাহলে খাদ্য উৎপাদন যে পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে তা দিয়ে আগামী ৫০ বছরের বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে। কাজেই আমাদের অতি জরুরি ভিত্তিতে কৃষি যান্ত্রিকায়ন করতে হবে।

অনেকেই প্রশ্ন করছেন, কৃষি যান্ত্রিকায়ন করা হলে এ খাতে সারপ্লাস বা উদ্বৃত্ত শ্রমশক্তির কী হবে? এই সমস্যার সমাধান কোনো কঠিন ব্যাপার নয়। কৃষি যান্ত্রিকায়ন করা হলে এ খাতে যে শ্রমশক্তি উদ্বৃত্ত হবে, তাদের অন্যত্র কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কৃষি যান্ত্রিকায়ন করা গেলে স্থানীয়ভাবে নানা ধরনের প্রক্রিয়াজাত কারখানা গড়ে উঠবে। কারণ কৃষি যান্ত্রিকায়নের পাশাপাশি গ্রাম এলাকায় শিল্পায়ন প্রক্রিয়া শুরু হবে। এসব শিল্প-কারখানায় শ্রমিকের প্রয়োজন হবে। এ ছাড়া সরকার দেশের বিভিন্ন স্থানে যে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন করতে যাচ্ছে, তার বেশিরভাগই গ্রামীণ এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হবে। ইতিমধ্যে ৮টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এগুলো যে কোনো সময় উদ্বোধন করা হবে। এ ছাড়া ২৮টি প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে। এসব প্রকল্পে ১৬ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

বাংলাদেশের গ্রাম আর আগের সেই গ্রাম নেই। গ্রাম এখন যে কোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রস্তুত। গ্রামীণ জনপদে বিদ্যুৎ, গ্যাস, জ্বালানিসহ অন্যান্য অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে প্রতিটি গ্রামই একেকটি উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। গ্রামীণ উন্নয়নের জন্য এখন মানসম্পন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান, উন্নত সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে প্রতিটি গ্রামই জাতীয় অর্থনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। আগে গ্রাম থেকে শহরে পুঁজি প্রবাহিত হতো। কিন্তু এখন শহর থেকে গ্রামে পুঁজি সঞ্চালিত হচ্ছে। যারা বিদেশে যাচ্ছেন তাদের বেশিরভাগই গ্রামের মানুষ। তারা প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশে পাঠাচ্ছে। সদ্যসমাপ্ত পঞ্জিকা বছরে প্রবাসী বাংলাদেশিরা ১ হাজার ৫৫৭ কোটি মার্কিন ডলার রেমিটেন্স দেশে পাঠিয়েছে। এটা এ যাবৎকালের মধ্যে সর্বোচ্চ রেমিটেন্স। আগামীতে প্রতি বছর প্রতিটি উপজেলা থেকে ১ হাজার জনকে বিদেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে পাঠানো হবে। এটা করা গেলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার আয় অনেকগুণ বৃদ্ধি পাবে।

দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে এখনও রফতানি খাত শীর্ষস্থানে রয়েছে। তবে এক অর্থে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিটেন্স রফতানি আয়ের চেয়েও জাতীয় অর্থনীতিতে বেশি পরিমাণ মূল্য সংযোজন করছে। কারণ রফতানি আয়ের পুরোটা জাতীয় অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজন করে না। এ খাতে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার এক বিরাট অংশই কাঁচামাল আমদানিতে চলে যায়। কিন্তু জনশক্তি রফতানি খাতে যে আয় হয় তার পুরোটাই জাতীয় অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজন করে। এ ছাড়া এই খাতটি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে বেকার সমস্যা দূরীকরণে বিরাট অবদান রাখছে। জনশক্তি রফতানি খাতের সম্ভাবনাকে আরও ভালোভাবে কাজে লাগানোর জন্য গ্রাম অথবা উপজেলাভিত্তিক কারিগরি শিক্ষার প্রসার বাড়াতে হবে। বাংলাদেশ থেকে যারা বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য যান, কারিগরি শিক্ষার অভাবে তারা বেতন-ভাতা কম পান। প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তি রফতানি করা গেলে এ খাতের আয় আরও অনেকগুণ বাড়ানো সম্ভব হবে।

শহুরে সুবিধা গ্রামে নিয়ে যাওয়ার জন্য আরও কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ করে গ্রাম এলাকায় বাড়িঘর নির্মাণের ক্ষেত্রে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা যেতে পারে। বর্তমানে যেখানে-সেখানে মানুষ তার বসতি গড়ে তুলছে। এতে মূল্যবান আবাদি জমি নষ্ট হচ্ছে। শহরে যেভাবে হাউজিং সোসাইটি গড়ে তোলা হয়, গ্রামেও ঠিক তেমনি উদ্যোগ নিতে হবে। আগামীতে গ্রামে চাষাবাদযোগ্য জমির তীব্র অভাব দেখা দেবে। তাই এখন থেকেই এ ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে। উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া বাড়িঘর নির্মাণের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা যেতে পারে। এ ছাড়া কোনো পরিবার সেপারেট হয়ে গেলে তারা নিজেদের ইচ্ছামতো বড় বড় এলাকাজুড়ে বাড়ি নির্মাণ করে থাকে।

এটাও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। গ্রাম এলাকায় বহুতল ভবন নির্মাণের ওপর জোর দিতে হবে। প্রয়োজনে বহুতল ভবন নির্মাণের জন্য ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বিভিন্ন সূত্রমতে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, রাস্তাঘাট নির্মাণ, বাড়িঘর তৈরি ইত্যাদি নানা কারণে প্রতি বছর এক শতাংশ হারে আবাদযোগ্য জমি কৃষি খাতের বাইরে চলে যাচ্ছে।

এটা চলতে থাকলে আগামীতে চাষযোগ্য জমি পাওয়াই মুশকিল হবে। গ্রামে বাড়িঘর নির্মাণের জন্য কোনো কোনো এলাকাকে নির্দিষ্ট করে দেয়া যেতে পারে। গ্রামাঞ্চলে যেসব রাস্তা আছে তার বেশিরভাগই চলাচলের উপযোগী নয়। এগুলো জরুরিভিত্তিতে সংস্কারের ব্যবস্থা করতে হবে। সম্ভাব্য স্বল্পতম সময়ের মধ্যে প্রতিটি গ্রামে পাকা রাস্তার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিটি গ্রাম থেকে যাতে নিকটবর্তী শহরে দ্রুত যাওয়া যায় তার উদ্যোগ নিতে হবে। প্রতিটি উপজেলাকে কমিউটার ট্রেনের মাধ্যমে শহরের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের গ্রামগুলো উন্নয়নের জন্য নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। এতে গ্রামীণ জীবনযাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। গ্রামের মানুষ এখন ক্রমশ কৃষিনির্ভরতা কাটিয়ে শিল্পের দিকে ধাবিত হচ্ছে। সরকার যে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন করতে যাচ্ছে, তার অন্তত ৫০টি কৃষিভিত্তিক বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। এটা করা হলে গ্রামীণ জনগণের কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে।

সরকার আগামীতে শহরের সুবিধা গ্রামে নিয়ে যাওয়ার যে পরিকল্পনা করছে, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী। কিন্তু এটা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কোনো কারণেই গ্রামের চিরন্তন ঐতিহ্য নষ্ট করা যাবে না। শহুরে সুবিধাকে গ্রামের উপযোগী করে প্রয়োগ করতে হবে। সরকার যদি শুধু অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে গ্রামের মানুষ নিজেদের উন্নয়ন নিজেরাই করতে পারবে। গ্রামের মানুষ উদ্ভাবনী শক্তির অধিকারী। তারা যে কোনো অসাধ্য সাধন করতে পারে। আগামীতে গ্রামই হবে উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার মূল হাতিয়ার। গ্রামের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধিত হলে মানুষ শহরমুখো হবে না। এতে শহরের মানুষ অনাকাক্সিক্ষত জনসংখ্যার চাপ থেকে মুক্তি পাবে। বিগত ১০ বছরে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য উন্নয়নের ‘রোল মডেলে’ পরিণত হয়েছে। আগামীতে গ্রামই হবে আমাদের উন্নয়নের মূল সূত্র। সে পথেই আমাদের এগোতে হবে। (সংগৃহীত)

লেখক: অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক