ঢাকা: ২০১৯-০২-১৬ ১০:৩১

Khan Brothers Group

এটা ২০১৮ সাল, কোন ষড়যন্ত্র কাজে লাগবে না: শামীম ওসমান

এশিয়ানমেইল২৪.কম

প্রকাশিত : ০৩:৫৩ পিএম, ২৭ আগস্ট ২০১৮ সোমবার | আপডেট: ০৩:৫৭ পিএম, ২৭ আগস্ট ২০১৮ সোমবার

ছবি: ইন্টারনেট

ছবি: ইন্টারনেট

নিজস্ব প্রতিবেদক: চার পুরুষ ধরে কোনো পরিবার রাজনীতি করছে এটি বিরল। শুধু বাংলাদেশই নয়, পৃথিবীর ইতিহাসেই এটি বিরল ঘটনা। কিন্তু নারায়ণগঞ্জের ওসমান পরিবার সেই বিরল ঘটনা ঘটিয়ে ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়েছেন। প্রয়াত রাজনীতিবিদ, দানবীর ও সমাজ সেবক খান সাহেব ওসমান আলীর পরিবার নারায়ণগঞ্জে আলো ছড়াচ্ছে প্রায় এক শতাব্দী ধরে। খান সাহেব ওসমান আলী ছিলেন বঙ্গীয় প্রাদেশিক আইনসভার সদস্য। এর পরের পুরুষ একেএম শামসুজ্জোহা। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের এই প্রতিষ্ঠাতা সদস্য একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।

ওসমান পরিবারের সবচেয়ে বেশি বিস্তৃতি ঘটেছে তৃতীয় পুরুষে এসে। একেএম শামসুজ্জোহার তিন সন্তান, নাসিম ওসমান, সেলিম ওসমান এবং শামীম ওসমান তিনজনই একাধিকবার করে সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন। আর তাদের উত্তরসুরীরাও বর্তমানে নারাযণগঞ্জের রাজনীতিতে বেশ আলোচিত নাম।

প্রয়াত একেএম শামসুজ্জোহার ছোট ছেলে শামীম ওসমান। তিনি শুধু নারায়ণগঞ্জেই নন, সারা দেশেই বেশ আলোচিত এবং মিডিয়ার মাধ্যমে পরিচিত মুখ। গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুতে নানান ধরনের সাহসী মন্তব্য করে তিনি সবসময়ই থাকেন আলোচনায়।

ওসমান পরিবারের ঐতিহ্য, রাজনীতি, ব্যবসা, দেশের সমসাময়িক পরিস্থিতি নিয়ে ভাবনা ও ভবিষ্যত পরিকল্পনা নিয়ে তিনি খোলামেলা কথা বলেছেন এশিয়ানমেইল২৪.কম এর সাথে। প্রবীন এই রাজনীতিবিদের সাক্ষাতকার নিয়েছেন আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক হাসিবুর রহমান। সাক্ষাতকারের চুম্বক অংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো:

এশিয়ানমেইল২৪.কম: কেমন আছেন? শারিরীক অবস্থার অনেক অবনতি হয়েছে মনে হচ্ছে...
শামীম ওসমান: আলহামদুলিল্লাহ। ভালো আছি। আমার স্বাস্থ্য কমেছে। এটা শারিরীক অবস্থার অবনতি নয়। ইচ্ছাকৃতভাবে স্বাস্থ্য কমানো। একটি বিশেষ চিকিৎসার সাহায্যে কমিয়েছি। এবং এখন অনেক ভাল আছি।

এশিয়ানমেইল২৪.কম: জাতীয় রাজনীতির বিভিন্ন বিষয়ে নানান ধরনের সাহসী মন্তব্য করে আপনি সবসময় মিডিয়ার আলোচনায় থাকেন। এটা কি আপনার একধরনের কৌশল?
শামীম ওসমান: রাজনীতি করি জনগণের সেবা করার জন্য। নারাযণগঞ্জের জনগণ আমাদেরকে তাদের হৃদয়ে যে স্থান দিয়েছে তার ঋণ শোধ করা আমাদের পক্ষে কোনভাবেই সম্ভব নয়। আমাদের প্রতি জনগণের এই ভালবাসার কারণ হলো কখনো কারো গোলামী করে আমরা রাজনীতি করিনি। সে কারণেই কোন কথা বলতে পরোয়া করি না। কে কি মনে করল সেটা নিয়ে ভাবি না। যেটা উচিত কথা সেটা সবসময় বলি। তবে সব কথা যে বলতে পারি তা নয়। যেগুলো দলীয় চেইন অব কমান্ডের বিষয় সেগুলো আমি জায়গা মতো বলি। সব কথা তো আর মিডিয়ার সামনে বলা যায় না, বলা উচিতও না।

এশিয়ানমেইল২৪.কম: নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে সব সময় একটি মুখোমুখি অবস্থান আমরা দেখি এবং এটি আপনার দলের মধ্যেই। এ বিষয়ে কি বলবেন?
শামীম ওসমান: এটি আমার মনে হয় না আর খুব বেশি আছে। কারণ আপনারা দেখেছেন যে সর্বশেষ হকার উচ্ছেদের ঘটনাকে কেন্দ্র করে কী হলো। যার সাথে আমার দ্বন্দ্ব তাকে সরাসরি কারা সমর্থন দিয়েছে তা সবার সামনে স্পষ্ট। যারা আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্ষমতা থেকে নামানোর জন্য, শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য প্রকাশ্য কথা বলে তারাই তাকে সমর্থন করেছে। শিবিরের মিডিয়া, বাঁশেরকেল্লা তাকে সবচেয়ে বেশি কাভারেজ দিয়েছে। বাঁশেরকেল্লা যাকে সমর্থন দিচ্ছে, কাভারেজ দিচ্ছে তাকে তো আর আওয়ামী লীগের নেতা বলা চলে না। আগামীতে আপনারা এর প্রতিফলন দেখতে পাবেন।

এশিয়ানমেইল২৪.কম: জাতীয় নির্বাচন খুবই সন্নিকটে। এটি নিয়ে কী ভাবছেন? দেশের পরিস্থিতি কোন দিকে যেতে পারে বলে মনে করছেন?
শামীম ওসমান: দেশ উন্নয়নের পথেই এগিয়ে যাবে। ভাল করে খেয়াল করবেন যে, কে ক্ষমতায় থাকল আর কে আসল এটা নিয়ে মানুষ আর ভাবে না। মানুষ চায় দেশে শান্তি, উন্নয়ন। শেখ হাসিনা ২০০৯ এ ক্ষমতায় আসার পর থেকে এখন পর্যন্ত দেখেন দেশ কতটা শান্তিতে আছে। যারা দেশকে শান্তিতে রেখেছে তাদেরকেই তো মানুষ আবারও নির্বাচিত করবে এটাই স্বাভাবিক। একারণে কেউ যদি নির্বাচনে হেরে যাবে ভেবে নির্বাচনেই না আসে তাহলে এটা তাদের নিজস্ব ব্যাপার। তবে আমি মনে করি না তারা এটা করবে। কারণ এবার নির্বাচনে না আসলে বিএনপি-জামায়াতের আর কোন অস্তিত্বই থাকবে না। আরেকটি বিষয় হলো, ষড়যন্ত্র করে কেউ যদি ক্ষমতায় আসতে চায় তাহলে সেটা আর সম্ভব নয়। বিদেশীদের কাছে ধরণা দিয়ে, সেনাবাহিনীর ঘাড়ে উঠে কেউ যদি ক্ষমতায় আসার চিন্তা করে তাহলে সেটা কখনোই বাস্তবায়ন হবে না। পঁচাত্তরে সেনাবাহিনী কি করেছে সেটা ভুলে যান। এটা ১৯৭৫ নয়, এটা ২০১৮।

এশিয়ানমেইল২৪.কম: সাম্প্রতিক যে দুটি বড় বড় আন্দোলন দেশে হলো সে বিষয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
শামীম ওসমান: আমাদের স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা যা করে দেখিয়েছে সেটা অকল্পনীয়। আমি তো ভেবেছিলাম যে মনে হয় আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম ফেসবুক আর চ্যাটিংয়েই জীবনের শেষ দেখে ফেলেছে। কিন্তু তারা যে কতটা দেশপ্রেম বুকে নিয়ে বেড়ে উঠছে সেটা তারা রাস্তায় নেমে প্রমান করে দিয়েছে। যে দেশে এই ধরনের কিশোররা বেড়ে উঠছে সেই দেশ কখনোই পথ হারাবে না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে যে বাংলাদেশ বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে সেই দেশ বিশ্বের নেতৃত্বে আসবে এই কিশোরদের হাত ধরেই। আর যারা তাদেরকে ব্যবহার করে ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখছিল, তাদের সেই স্বপ্ন কখনোই পূরণ হবে না। তারা যে কতটা গণবিচ্ছিন্ন সেটা তারাই প্রমাণ করল এমন একটি আন্দোলনে ষড়যন্ত্র করে।

এশিয়ানমেইল২৪.কম: আপনারা তিন পুরুষে ব্যবসায়ী। এবং সবাই সফল ব্যবসায়ী। সাফল্যের পিছনে মূলমন্ত্র কী বলে মনে করেন?
শামীম ওসমান: আপনি যে ব্যবসাটা করতে আসবেন সেটা আগে আপনাকে বুঝতে হবে। না বুঝে, না জেনে আবেগের বশে কোন ব্যবসা শুরু করলে ধ্বসে পড়ার সম্ভাবনাই বেশি। কারো কারো ভাগ্য ভাল হলে হয়তো দাঁড়িয়ে যেতে পারে, সেটা ভিন্ন কথা। কিন্তু আগে বুঝতে হবে আপনার ব্যবসার ধরণ কি, সেটার জন্য কি করতে হবে। যারা নতুন করে ব্যবসায় আসতে চায় তারা যেন ওই ব্যবসার ধরণ ভাল করে বুঝে আসে। যে কোন ধরনের ব্যবসা শুরু করার আগে, সে ধরনের কোন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কিছুদিন কাজ করে, ব্যবসাটা শিখে আসলে সফল হওয়ার সম্ভাবনা শতভাগ। আর সততা তো লাগবেই। মানুষকে ঠকিয়ে কখনোই বেশি দিন টেকা যায় না।

এশিয়ানমেইল২৪.কম: ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে আপনি প্রথম এসি বাস সার্ভিস চালু করেছেন। পাশের কোন জেলার সাথে এটিই তো বাংলাদেশে প্রথম এসি সার্ভিস...
শামীম ওসমান: সব সময় মনে রাখবেন যে ‘টাইম ইজ মানি’। যখন কেউ একটি সাধারণ লোকাল বাসে করে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ যাতায়াত করে তখন তার পুরো সময়টাই নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু আমরা যে বাস সার্ভিস চালু করেছি তাতে ফ্রি ওয়াইফাইয়ের ব্যবস্থা আছে। এখন আর সময় নষ্ট হচ্ছে না। রাস্তায় বসেই এখন মানুষ অনেক কাজ সেরে নিতে পারছে। এখন যেহেতু সব কিছুই অনলাইনে, সুতরাং নিরিবিলি পরিবেশে ইন্টারনেট সুবিধা টা খুবই দরকার। এ চিন্তা করেই চালু করা। আর লাভ-লস তো ভাগ্যের ব্যাপার। এখন পর্যন্ত ‘শীতল এসি সার্ভিস’ খুবই ভাল চলছে। দেখা যাক আগামীতে কি হয়।

এশিয়ানমেইল২৪.কম: রাজনীতি করছেন দীর্ঘদিন ধরে। ভবিষ্যত ভাবনা কী?
শামীম ওসমান: ২০২১ সালে আমার বয়স ৬০ পূর্ণ হবে। আল্লাহ যদি বাঁচিয়ে রাখেন, আপাকে (শেখ হাসিনা) আল্লাহ যদি আবার প্রধানমন্ত্রী করেন তাহলে অবসরের চিন্তা করতে হবে। দেশ তখন নিশ্চিত গন্তব্যে এগোবে। আমাদের আর খুব বেশি লড়াই করতে হবে না। আমরা যে সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে রাজনীতি করেছি তার থেকে ভবিষ্যত পুরোপুরি আলাদা। আমরা রাজনীতি করেছি দেশের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে। কিন্তু আগামীর চ্যালেঞ্জটা পুরোপুরি আন্তর্জাতিক। এটা সারা বিশ্বের সাথে অর্থনৈতিক লড়াই। সেখানে লড়াই হবে শুধুই মেধা দিয়ে। সে কারণে আমি মনে করি যে আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে লড়াই করার মতো আরও প্রশিক্ষিত নেতৃত্ব দরকার।

এশিয়ানমেইল২৪.কম: আপনার জীবন এবং রাজনীতির আদর্শ কে?
শামীম ওসমান: অবশ্যই আমার বাবা। আমি রাজনীতি শিখেছি আমার বাবার কাছ থেকে। আমরা যেহেতু তিন পুরুষ ধরে রাজনীতি করা পরিবার তাই জন্মের পর থেকেই বাবাকে রাজনীতির মাঠে দেখেছি। বাবার হাত ধরেই রাজনীতি এসেছি। আমরা রাজনীতিতে এসেছি আবেগ নিয়ে। ক্লাস এইটে পড়া অবস্থায় প্রথম জেলে গিয়েছি। আমি রাজনীতি শুরু করার পর থেকে একটিই আবেগ কাজ করেছে, ‘বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার চাই’। আর এরপর থেকে আপার (শেখ হাসিনা) খুবই কাছে থেকে রাজনীতি শিখেছি, করেছি। এখনও আপার খুব কাছেই আছি।

এশিয়ানমেইল২৪.কম: সময় দেয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
শামীম ওসমান: এশিয়ানমেইল২৪.কম এবং আপনাকেও ধন্যবাদ।


ও/র