ঢাকা: ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ৯:৫৫

কতটা সফল হবেন রাহুল গান্ধী?

এশিয়ানমেইল২৪.কম

প্রকাশিত : ১১:৪০ এএম, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৭ সোমবার | আপডেট: ১২:৩৯ পিএম, ৬ জানুয়ারি ২০১৮ শনিবার


বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী : ভারতের কংগ্রেস পার্টির সভাপতি পদে রাহুল গান্ধী গত সোমবার ১১ই ডিসেম্বর (২০১৭) বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় নির্বাচিত হয়েছেন। আমাদের প্রতিবেশী দেশের প্রাচীনতম পার্টির সভাপতি হলেন তিনি। তার দেশ তার পরিবার এবং তার দল বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে জড়িত আমরা তার কংগ্রেসের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠানকে অভিনন্দন জানাই।

কংগ্রেসের এই সর্বোচ্চ পদটিতে কখনও প্রতিদ্বন্দ্বীতা হয়নি। কংগ্রেস ওয়াকিং কমিটির পছন্দ অপছন্দকে সবাই মেনে নিয়েছিলেন। শুধু ১৯৩৯ সালে কংগ্রেসের ত্রিপুরী সম্মেলনে কংগ্রেস সভাপতি পদে সুভাষ চন্দ্র বসু এবং গান্ধীর প্রার্থী ভোগরাজু পট্টভী সীতারামাইয়্যার সঙ্গে সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বীতা হয়েছিলো। সুভাষ চন্দ্র বসু পেয়েছিলেন ১৫৮০ ভোট আর পট্টভী সীতারামাইয়্যা পেয়েছিলেন ১৩৭৫ ভোট। গান্ধী খুবই দুঃখিত হয়েছিলেন এবং আবেগে বলে ফেলেছিলেন “দি ডিফিট অব সিতারামাইয়া ইজ মাই ডিফিট”।

সত্যই গান্ধীকে অপমানিত করে সুভাষ বাবুর পক্ষে সভাপতির পদে থাকা অসম্ভব হয়েছিলো। তিনি ওয়ার্কিং কমিটিই গঠন করতে পারেননি। অবশেষে পদত্যাগ করেছিলেন। তার পদত্যাগের পর রাজেন্দ্র প্রসাদ অবশিষ্ট সময়ের জন্য কংগ্রেসের সভাপতি ছিলেন। আর সুভাষ বসু কংগ্রেস ত্যাগ করে ফরওয়ার্ড ব্লক গঠন করেছিলেন।

১৯৮১ সালে দক্ষিণের এক খ্যাতিমান গণক ঠাকুর এসেছিলেন প্রধানমন্ত্রীর সফদর জং রোডের বাংলোয়। ইন্দিরা গান্ধী ঠাকুরকে জিজ্ঞেস করেছিলেন তার পরিবার কয় প্রজন্ম ভারতের ক্ষমতায় থাকবে। ঠাকুর উত্তরে বলেছিলেন তিন প্রজন্ম। ইন্দিরা গান্ধী আতঙ্কিত হয়ে ঠাকুরকে জিজ্ঞেস করেছিলেন প্রজন্মের গণনা কি মতিলাল থেকে শুরু হবে? ঠাকুর বলেছিলেন প্রজন্মের হিসাব হবে নেহরু থেকে। নেহরু, ইন্দিরা, রাজীব- তিন প্রজন্ম শেষ। গণক ঠাকুরের কথায় কোন সত্যতা থাকলে নেহরু পরিবারের আর কেউ ক্ষমতায় আসবে না।

সোনিয়া গান্ধী এ ঘটনাটা জানতেন এর পরও তিনি তার ক্ষমতার প্রতি অনাসক্ত পূত্র রাহুলকে টেনে এনে সভাপতি পদে বসালেন। ইংরেজ মহিলার গণক ঠাকুরের প্রতি মনে হয় বিশ্বাস নেই।

রাহুল গান্ধী খুব কঠিন সময়ে কংগ্রেসের সভাপতি হলেন। কংগ্রেস এখন পাঞ্জাব ও কর্ণাটকের মত দু’টি বড় রাজ্যে ক্ষমতায় আর সর্বত্র বিরোধী দল। লোকসভায় ২০১৪ সালের নির্বাচনে গো-হারা হেরেছিলো কংগ্রেস। আসন পেয়েছিলো মাত্র ৪০টি। পরবর্তী সময়ে উপ-নির্বাচনে জিতে এখন হয়েছে ৪৪টি। অনুরূপ অবস্থা থেকে কংগ্রেসকে তুলে আনা খুবই কঠিন কাজ। সে দায়িত্বটাই এসে পড়েছে রাহুলের উপর।

এখন রাহুল গান্ধী ব্যস্ত রয়েছেন গুজরাট বিধান সভার নির্বাচন নিয়ে। আহমদাবাদে গত ১২ই ডিসেম্বর একটা সংবাদ সম্মেলনও করেছেন তিনি। গুজরাট বিধানসভার নির্বাচনে জেতার বিষয়ে আশাবাদও ব্যক্ত করেছেন। গত ২২ বছরব্যাপী গুজরাটে বিজেপি ক্ষমতায়। আজকের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গুজরাটেরই মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন দীর্ঘ ১২ বছর। গুজরাট থেকেই তার উত্থান।

বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ-এর বাড়ীও গুজরাটে। উভয়ে আরএসএস-এর ক্যাডার ছিলেন। এখনও নাগপুর আশ্রমে তারা নিয়মিত হাজিরা দেন এবং মহারাজ ভগওয়াতের আর্শিবাদ ও রাষ্ট্র পরিচালনার পরামর্শ নিয়ে আসেন। নরেন্দ্র মোদী সম্পূর্ণভাবে হিন্দু দর্শনে বিশ্বাসী লোক। তিনি বোম্বের বিজ্ঞান সম্মেলনে প্রকাশ্যে বলেছেন গণেশের মাথায় হস্তিমুখ স্থাপন প্রাচীনকালে শৈলাবিদ্যায় ভারতীয় শৈলবিধদের সুনিপুণতার নিদর্শন।

আধুনিক বিজ্ঞানের সম্মেলনে উপস্থিত থেকে প্রাচীন কল্প-কাহিনীর কথাকে বাস্তব চিত্র হিসেবে তুলে ধরতে তিনি কোনো দ্বিধাদ্বন্ধে ভূগেননি। আগামী লোকসভা নির্বাচনে ২০১৯ সালে রাহুলকে আধুনিককালের বাস্তবতা নিয়ে মোকাবেলা করতে হবে নরেন্দ্র মোদির প্রাচীনকালের কল্পকাহিনী। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি সম্পূর্ণভাবে হিন্দুত্ববাদ নিয়ে জনসম্মুখে উপস্থিত হবে। হিন্দুত্ববাদের স্লোগান নিয়ে মাঠে নামার সবপ্রস্তুতি নিয়েই বিজেপি অগ্রসর হচ্ছে।

রাহুল গান্ধী বহুদিন থেকে ধর্মনিরপেক্ষতাকে তার “নামফলক” বানিয়েছেন। গোড়া হিন্দুত্ববাদের মোকাবেলায় বৈচিত্রের মাঝে ঐক্য এবং ধর্মনিরপেক্ষতাবাধ এর আদর্শকে নিয়ে রাহুলের পথ চলা খুব সহজ হবে বলে মনে হয় না। রাহুলের ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের বিশ্বাসে কোনো ভেজাল আছে বলেও মন হয় না। বৈচিত্রের মাঝে ভারতের ঐক্য সম্পর্কে প্রবীন ভারতীয় নেতারা যে ধারণা গড়ে তুলেছিলেন সংঘ পরিবারের গত ৭০ বছরের বিরুদ্ধে অবস্থান তাকে কিছু আলগা করে ফেলেছে।

গো-বলয়ে তাদের ২৫ লক্ষ সেবক সার্বক্ষণিক কাজ করে। একজাত এক নিশান তাদের মুখ্য লক্ষ্য। সংঘ-পরিবার তাই ঘরওয়াপসির কর্মসূচী নিয়েছে। ঘরওয়াপসির কর্মতৎপরতা কি কখনও ২২ কোটি মুসলমানকে হিন্দু বানাতে পারবে? অবশিষ্ট ৮ কোটি খৃষ্টান ২ কোটি বৌদ্ধকেও তো তারা ঘরওয়াপসির দাওয়াত দিচ্ছে। ওড়িষ্যায় তারা কিছু খৃষ্টানকে পুড়িয়ে মেরেছে। ২০০২ সালে গুজরাটের দাঙ্গায় বিপুল সংখ্যক মুসলমানকে নির্বিচারে হত্যা করেছে।

এই যে সারা দেশব্যাপী হিন্দুত্ববাদের কথা তারা ছড়িয়ে দিয়েছে রাহুলের ধর্মনিরপেক্ষবাদ তা কি মোকাবেলা করতে পারবে? ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ শক্তিশালী হয় এবং তার নেতৃত্ব দেয় ধার্মান্ধ শক্তি আর অশিক্ষিতের দল। গুজরাটের নির্বাচনকে অনেক বিশ্লেষক রাহুল এবং নরেন্দ্র মোদির জন্য এসিড স্টেট বলেছেন। নরেন্দ্র মোদির জন্য বিষয়টা এসিড স্টেট তুল্য তা সত্য কারণ গুজরাট নরেন্দ্র মোদির নিজ রাজ্য। এখানে বিজেপি পরাজিত হলে ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদির ভিত্তি দুর্বল হবে।

রাহুলের জন্য গুজরাট এসিড স্টেট হতে পারে না। জেতার সাফল্য ছাড়াও বেশী সংখ্যক আসনে জেতাও রাহুলের জন্য বিজয়। কারণ গত ২২ বছরব্যাপী ক্ষমতায় না থাকার কারণে কংগ্রেস গুজরাটে কংকালসার হয়ে গেছে। আর গুজরাট থেকে বিজেপির ভ্যাটিকান নাগপুর তো তেমন দূরে নয় নির্বাচন উপলক্ষে তিন লক্ষ আর এসএস ক্যাডার এসেছে গুজরাটে। নরেন্দ্র মোদি প্যাটেল সম্প্রদায়ের বৈরীতার মুখে পড়ে ৬০ জন প্যাটেলকে মনোনয়ন দিয়েছেন বিধানসভায়। নরেন্দ্র মোদি আর আমিত শাহ কৌশল কোনোটানই বাদ রাখেননি। এ পর্যন্ত জনমত জরিপ যতগুলো দেখেছি তাতে বিজেপি জিতে যাবে, তবে কংগ্রেসের সীট বেড়ে যাবে অনেক।

ভারতে কংগ্রেস প্রাচীন দল। তার সর্বভারতীয় কাঠামোও প্রাচীন। বিজেপি এখনও পরিপূর্ণভাবে সর্বভারতীয় দল হয়নি। তার সর্বভারতীয় কাঠামোও নবীন। তাকে শক্তি যোগায় আর.এস.এস-এর ২৫ লক্ষ ক্যাডার আর সাধু-সন্ন্যাসীরা। তাও গো-বলয়ে সীমাবদ্ধ। ২০১৪ সালে বিজেপি আসন পেয়েছে গোবলয়ের রাজ্যগুলোতে। এবার রাহুল ও কংগ্রেসকে কৌশলী হতে হবে। এবার ২০১৯ সালের নির্বাচনে রাহুলকে প্রধানমন্ত্রীর প্রার্থী করে নির্বাচন করলে কংগ্রেস ভাল সুবিধা আদায় করতে পারবে বলে মনে হয় না।

ভারতে রাষ্ট্রপতি অবসরে এসে সাধারণত রাজনীতিতে যোগদান করেন না। তবে সাংবিধানিক কোনো বাধা নেই। সদ্য অবসরে আসা প্রণব বাবুর আগা গোড়া কংগ্রেসের মানুষ। সর্বভারতীয় ইমেজ আছে তার। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তাকে মহারাষ্ট্রের শিবসেনাও সমর্থন করেছিলো। তার অভিজ্ঞতাও প্রচুর। বলে কয়ে তাকে প্রধানমন্ত্রীর প্রার্থী হিসেবে প্রোজেক্ট করার চেষ্টা করলে হয়ত কংগ্রেস সংকট থেকে উত্তরণ করতে পারবে।

প্রণব বাবুর যশ খ্যাতির মূলে কংগ্রেস দলই। সে প্রাচীন দলটি সংকটে পড়েছে তাকে সংকট থেকে তুলে আনা প্রণব বাবুরও দায়িত্ব। কংগ্রেসের দায়িত্ব নেওয়ার পর রাহুলকেও সর্ব বিষয়ে সচেতন হয়ে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। তার ঠাকুর মার সময় এখন আর নেই। কঠোর পরিশ্রম ছাড়া ফল লাভের প্রত্যাশা করা হঠকারিতা হবে। সূত্র : পরিবর্তন

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক
bakhtiaruddinchowdhury@gmail.com

জেডসি