ঢাকা: ২০১৮-০৬-২৪ ১:৩৫

Khan Brothers Group

কৃষকের জামানতবিহীন ঋণ কাগজে আছে, বাস্তবে নেই

এশিয়ানমেইল২৪.কম

প্রকাশিত : ০৫:৩৭ পিএম, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ মঙ্গলবার | আপডেট: ০৫:০২ পিএম, ৪ মার্চ ২০১৮ রবিবার

মোহাম্মদ ইসমাইল। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের (বিকেবি) চেয়ারম্যান। এ পদে দায়িত্বে আছেন ২০১৪ সালের ডিসেম্বর থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে পড়াশোনা করা এ ব্যাংকার পেশাগত জীবন শুরু করেন শিক্ষকতা দিয়ে। প্রথমে ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের শিক্ষক, পরে মিরপুর বাঙলা কলেজের প্রিন্সিপালের দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষকতা ছেড়ে ১৯৭৭ সালে বিসিএস প্রশাসনে যোগ দেন। ২০০৩ সালে কৃষি মন্ত্রণালয়ের বীজ উইংয়ের মহাপরিচালক ও ২০০৪ সালে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। সম্প্রতি তিনি কৃষি, কৃষক ও কৃষি অর্থনীতিতে বিকেবির অবদান এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছেন এশিয়ানমেইল২৪.কমের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সিনিয়র রিপোর্টার আহমেদ তোফায়েল।


এশিয়ানমেইল২৪.কম : কৃষি, কৃষক এবং কৃষি অর্থনীতিতে বিকেবির ভূমিকা সম্পর্কে বলুন।

মোহাম্মদ ইসমাইল: কৃষি, কৃষক এবং কৃষি অর্থনীতি- এ তিন জায়গায় বিকেবির বড় একটা ভূমিকা রয়েছে। এ জন্য যে, দেশের বেশিরভাগ কৃষক কিন্তু প্রান্তিক পর্যায়ের। তারা যদি ভালো থাকেন, তাদের অর্থনীতি যদি ভালো হয়, তাহলে দেশের অর্থনীতিও ভালো হবে। ২০২১ সালে যে মধ্য আয়ের দেশ কিংবা ২০৪১ সালে যে উন্নত অর্থনীতি হবে তার সঙ্গে কৃষকদের যদি উন্নতি না হয়, তাহলে ঢাকা শহরের ১০৭ তলা বিল্ডিং করেও কোনো লাভ হবে না। কারণ আনুপাতিক হারের বেশিরভাগ লোকজন বাস করেন গ্রামে। এ ক্ষেত্রে কৃষি ব্যাংকের ভূমিকা ও অবদান অনেক বড়। বিকেবি সব সময় কৃষকদের পাশে আছে। ১৯৭০ সালে যেখানে দেশে ৯০ লাখ টন খাবার উৎপাদন হতো এখন তা চারগুণ ছাড়িয়ে তিন কোটি ৮০ লাখ টন হচ্ছে। এখানে কৃষি ব্যাংকের অবদান অনেক। কৃষিতে কৃষকের যে টাকাটা লাগে, সে টাকা কৃষি ব্যাংক দেয়। এ ব্যাংক কৃষকের বিপদের বন্ধু। তা না হলে কৃষকদের মহাজনের কাছে যেতে হতো। কৃষি ব্যাংক কৃষকের কাছ থেকে ১০০ টাকায় সুদ নেয় ৯ টাকা। আর মহাজনরা কত নেয় তা আপনারা ভালো জানেন।  

এশিয়ানমেইল২৪.কম : কৃষি ব্যাংক কি কৃষকের হতে পেরেছে?

মোহাম্মদ ইসমাইল : আমি বলব, কৃষি ব্যাংকই আসলে কৃষকের প্রকৃত ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানটি শতভাগ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক। এটি বাংলাদেশের কৃষির মতো প্রকৃতিনির্ভর অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ খাতে অর্থায়নের জন্য বৃহত্তম বিশেষায়িত ব্যাংক। আমানত, ঋণ, বৈদেশিক বাণিজ্যসহ সব ধরনের আধুনিক ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে বিকেবি। ১ হাজার ৩১টি শাখার মধ্যে ২৪৬টি অনলাইন ও ৪৬১টি অটোমেটেড শাখার মাধ্যমে সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনা করে ব্যাংকটি। দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কৃষি খাতের উন্নয়নের মাধ্যমেই এ দেশের কৃষকদের ভাগ্যোন্নয়ন সম্ভব। সর্ববৃহৎ প্রতিষ্ঠান হিসেবে কৃষিখাতে বিনিয়োগের দায়িত্ব কৃষি ব্যাংকই নিয়েছে। বিভিন্ন ঋণ কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বচ্ছতা ও দ্রুততার সঙ্গে এবং সহজ শর্তে প্রকাশ্যে গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে কৃষকের হাতে ঋণের টাকা পৌঁছে দিচ্ছে।

এশিয়ানমেইল২৪.কম : কৃষিক্ষেত্রে বর্তমানে চ্যালেঞ্জ কী দেখছেন?

মোহাম্মদ ইসমাইল : কৃষিক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ হলো- কৃষিতে অনেক বৈচিত্র্য এসেছে। যেমন- আগে গরু দিয়ে চাষ হতো। এখন পাওয়ার টিলার বা ট্রাক্টর দিয়ে হয়। তারপর ড্রাম সিডার দিয়ে বীজ বোনা হচ্ছে। অর্থাৎ কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। কৃষির পরিবর্তনের মধ্যে আগে যেমন আউশ ধান চাষ হতো, সেটা একেবারেই নেই বললেই চলে। এখন শুধু বোরো আর আমন চাষ হয়। কোনো কোনো জায়গায় অনেকে ধানের পরিবর্তে ফুল কিংবা পেঁয়াজ চাষ করছেন। কৃষকরা নিজেই বোঝেন কোনটা চাষ করলে তিনি লাভবান হবেন। কখন ধান, ভুট্টা, কখন গম চাষ করতে হবে পারিপার্শ্বিক অবস্থার সঙ্গে কৃষক খাপ খাইয়ে নিচ্ছেন। কৃষক যে পথে হাঁটছে ব্যাংককেও সে পথে যেতে হচ্ছে। এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো- খুব সহজে কোনো জটিলতা ছাড়া কৃষকের কাছে ঋণ পৌঁছে দেয়া। শুধু ঋণ নয়, তাকে দিতে হবে পর্যাপ্ত ঋণ। অর্থাৎ একজন কৃষকের টাকা লাগবে তিন লাখ আর আমি দিলাম দেড় লাখ, বাকি টাকার জন্য তিনি যাবেন কোথায়? তারা চেষ্টা করছেন, কম সময়ের মধ্যে কৃষকের হাতে তার চাহিদা অনুযায়ী টাকাটা তুলে দিতে।

 



এশিয়ানমেইল২৪.কম : আপনি যত সহজে বললেন, কৃষক কী এত সহজে ঋণ পাচ্ছেন?

মোহাম্মদ ইসমাইল : হ্যাঁ পাচ্ছেন তো। তারা অনেকটাই এগিয়েছেন। আগে একটা সময় ছিল, ঋণ নিয়ে বছর শেষে সেটা শোধ দিয়ে আবার নিতে হতো। এখন আর সেটা করা লাগে না। কোনো কৃষক ১ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ৯ শতাংশ সুদ সময়ের মধ্যে দিয়ে দিলেই তার প্রয়োজন অনুযায়ী আবার নতুন ঋণ দেয়া হচ্ছে। আগে লোন পেতে গ্রাহকদের অনেক হয়রানির শিকার হতে হতো। এখন সরাসরি শাখার ম্যানেজারের কাছে গেলেই হচ্ছে। আগে টাকা না দিলে কৃষকের বিরুদ্ধে মামলা-মোকাদ্দমা হতো, এখন বলছেন মামলা-মোকাদ্দমার দরকার নেই। গ্রাহকদের ডাকো, মিটিং করো। তার সঙ্গে বসে চা খাও। চা খেতে খেতে তাকে বল যে, ব্যাংকের টাকার দরকার।’ এখানে কৃষি ব্যাংকের সঙ্গে গ্রাহকের একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। তারা মনে করেন, সরকারি ব্যাংক থেকে টাকা নিলে আর ফেরত না দিলেও চলে। কৃষি ব্যাংক তো লাভ করার মতো ইনস্টিটিউশন না। প্রতি বছরই লোকসান গুনতে হচ্ছে। ব্যাংকের যা খরচ তার চেয়ে কমে কৃষকদের ঋণ দেয়া হচ্ছে। তারা মনে করেন, এটা হলো কৃষি ব্যাংকের এক ধরনের সেবা। গ্রাহকের বুঝা উচিত, এ সেবাটা তাকে দেয়া হচ্ছে কেন? সময় মতো টাকা নিয়ে কাজে লাগানোর জন্য। আর টাকাটা যদি কাজে না লাগানো হয় তাহলে ঋণটা বাড়তেই থাকবে। সময় মতো তিনিও টাকা ফেরত দিতে পারবেন না। তখনই ঝামেলাটা হয়।

এশিয়ানমেইল২৪.কম : তার মানে খেলাপি আদায়ে আপনারা কৃষকের সঙ্গে সমঝোতা করছেন। সার্টিফিকেট মামলা করছেন না।

মোহাম্মদ ইসমাইল : না, না, মামলা হচ্ছে। কারণ, একটা পর্যায়ে যদি মামলা না করেন তাহলে তিনি টাকা ফেরত দিতে আসবেন না। মামলা করার আগে তার সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করেন। আবার যাদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে মামলা আছে তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, ব্যাংকের পাওনা দিয়ে দিলে মামলা তুলে নেবেন।

এশিয়ানমেইল২৪.কম : শিল্পখাতের আরেকটি বিপ্লবে বাণিজ্যিক কৃষির কোনো বিকল্প নেই। আপনি কি মনে করেন?

মোহাম্মদ ইসমাইল : হ্যাঁ, একদম ঠিক। এ কথাটা অতিমাত্রায় সত্য। কারণ এখন ধান উৎপাদন ভালো হচ্ছে। ধানকে চাল বানিয়ে কিছু রপ্তানি করতে পারেন। আবার অন্যটাও করা যেতে পারে। চাল রপ্তানি না করে তা থেকে প্রোডাক্ট তৈরি করে বেশি পয়সা পেতে পারেন। শাক-সবজির ক্ষেত্রে ধরুন, টমেটো। টমেটোর কেজি এখন ৬০ টাকা। প্রান্তিক কৃষকরা আসলে ১৫ টাকাও পাচ্ছেন না। আরও কম পাচ্ছেন। কারণ এ খরচের হারটা নিয়ে যাচ্ছে পরিবহন (ট্রান্সপোর্ট)। খুচরা বিক্রেতারা যে খুব বেশি লাভ করছেন সে ধারণাও ঠিক না। তার মনে হয়, ট্রান্সপোর্টই মূলত বেশি সমস্যা। তিনি বলছেন, কৃষিপণ্য বহুমুখীকরণের দিকে যাচ্ছে, আরও যেতে হবে।

এশিয়ানমেইল২৪.কম : তার মানে আপনি মূল্য সংযোজনের (ভ্যালু এডিশন) কথা বলছেন?

মোহাম্মদ ইসমাইল: হ্যাঁ, মূল্য সংযোজন ও পণ্যের বৈচিত্র্যতার কথাই বলছেন। যেমন- টমেটো বিক্রি করবেন না, টমেটোর সস করবেন। এগুলো মার্কেটে খুব খাচ্ছে। কৃষিপণ্যের বৈচিত্র্যতায় ‘প্রাণ কোম্পানি’ বাংলাদেশের বড় উদাহরণ। তার মানে ভোগ্যপণ্যের সমৃদ্ধি বাড়ছে। এখন থেকে ৩০ বছর আগে কৃষিপণ্যের বহুমুখীকরণ ইংল্যান্ড-আমেরিকাতে দেখেছেন। তারা এখন ভোগ্যপণ্য সরবরাহ করছে। তাদের খাদ্যাভ্যাস (প্যাটার্ন) পরিবর্তন হয়েছে। শুধু ভাত এখন কেউ খায় না। ভাত খাওয়া কমিয়ে দিয়েছে। ভাতের সঙ্গে সালাদ খাচ্ছে। তার মানে, মানুষ পুষ্টির দিকে ঝুঁকছে। খাবারের আইটেম বদলে গেছে। সুতরাং কৃষির যে বাণিজ্যিক ব্যবহার সেটার কোনো বিকল্প নেই। এদিকে তাদের যেতেই হবে।

এশিয়ানমেইল২৪.কম : কৃষক বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদন বাড়াচ্ছেন। কিন্তু দাম পাচ্ছেন না।  অথচ ব্যাংক ঋণের সুদ গুনতে হচ্ছে। বারবার ঋণের বৃত্তে আটকা পড়ছে। সমাধান কী?

মোহাম্মদ ইসমাইল : এখানে সমাধানটা হচ্ছে কৃষকদের ইউনিয়ন বা সমবায় সমিতি করতে হবে। পরিবহন ব্যয়ের প্রশ্ন না। আলু কোল্ড স্টোরেজে রাখতে হবে। ২০ বছর আগের কোল্ড স্টোরেজ আর বর্তমান কোল্ড স্টোরেজগুলো এক নয়। এখনকার কোল্ড স্টোরেজগুলোতে আলু রাখলে ছয় মাস পরও বুঝা যাবে না। আমাদের যেখানে আলু রাখা দরকার সেখানে আলু রাখতে হবে, যেখানে পেঁয়াজ রাখার দরকার সেখানে পেঁয়াজ রাখতে হবে। পুনঃপ্রক্রিয়ার বিষয়টা (রিঅর্গানাইজড) জানতে হবে আমাদের। টোটাল আইডিয়াটাতে যদি মর্ডানাইজেশন না আনা যায়, তাতে কোনো লাভ হবে না।

এশিয়ানমেইল২৪.কম : অন্য ব্যাংকের সঙ্গে কৃষি ব্যাংকের নীতিগত পার্থক্য কোথায়?

মোহাম্মদ ইসমাইল : আমরা প্রধানত ঋণ দেই কৃষি আর এসএমই সেক্টরে। প্রাইভেট ব্যাংকগুলো লোন দেয় ৪০০-৫০০ কোটি টাকা। আর আমরা দেই এক, দুই কিংবা পাঁচ কোটি পর্যন্ত। তাতে করে গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। আমরা রুরাল এরিয়ায় বেশি টাকা দেয়ার জন্য চেষ্টা করছি। এ ক্ষেত্রে দুই বছর আগেও বছরে যেখানে পাঁচ হাজার কোটি টাকা লোন দিতাম, এখন সেটাকে বাড়িয়ে সাত হাজার কোটি টাকা করেছি। আপনি অন্য ব্যাংকের সঙ্গে পার্থক্য জানতে চেয়েছেন। সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো অন্যান্য ব্যাংক যে সব কৃষককে ঋণ দিতে পারে না, আমরা তা পারি। বেসরকারি ব্যাংকের শাখা কম থাকায় আমরা সব ক্ষেত্রেই কৃষকের কাছে পৌঁছাতে পারি। কৃষি ব্যাংকের পর যদি কোনো ব্যাংক থাকে, সেটি হলো রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক। কারণ তাদেরও অনেক শাখা আছে। ফলে সোনালী ব্যাংক কিছু ঋণ দিতে পারে। কিন্তু তাদেরও ওই ধরনের কোনো এক্সপার্টিজ নেই। অতএব কৃষি সংক্রান্ত যাবতীয় ঋণ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব) দিয়ে থাকে। কোনো ব্যাংকই বাইরে থেকে অর্থ নিয়ে আসে না। সব ব্যাংকই তাদের আমানতের অর্থ ঋণ হিসেবে দেয়। আমরা আগে কৃষকদের গরু পালনের জন্য ঋণ দিতাম। কিন্তু এখন আর গরু পালনের জন্য খুব বেশি ঋণ দেয়া লাগে না। তাই আমরা এখন কলের লাঙলের জন্য ঋণ দিয়ে থাকি। যান্ত্রিকীকরণের জন্য এখন ঋণ দিতে শুরু করেছি। কৃষিতে যে সব জায়গায় ডাইভারসেশন হয়েছে, কৃষি ব্যাংক তার প্রতিটি জায়গায় ঋণ দিয়েছে। কৃষি ব্যাংকের সহযোগিতায় কৃষকরা সাফল্য আনতে সক্ষম হয়েছে।

 



এশিয়ানমেইল২৪.কম : কৃষি ব্যাংকের ঋণ নিতে কী ধরনের জামানত দিতে হয়?

মোহাম্মদ ইসমাইল : সিকিউরিটি দেয়ার ক্ষেত্রে আমরা দেখি তার (কৃষকের) জমিটা আছে কিনা। ধরুন, কেউ কলাচাষের জন্য লোন নিচ্ছেন। আমরা দেখি তার সে কলাচাষের জমি আছে কিনা। তার জমিটা সিকিউরিটি হিসেবে থাকবে। বর্গাচাষিদেরও ঋণ দেয়া হয়। সেখানে বর্গার যে মালিক তার সিকিউরিটি লাগবে তার জমি।

এশিয়ানমেইল২৪.কম : জামানতবিহীন কোনো ঋণ কী কৃষি ব্যাংক দিচ্ছে?

মোহাম্মদ ইসমাইল : আমাদের কাগজপত্রে (থিওরিটিক্যালি) আছে, ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণে কোনো জামানত লাগবে না। যদিও বাস্তবে (প্রাকটিক্যালি) এটা হয় না। এ জন্য যে, সংশ্লিষ্ট ম্যানেজার তার চাকরি হারানোর ভয়ে থাকেন (মে লুজ হিজ জব)। লোন দেয়ার ক্ষেত্রে দেখা যায়, অনেকে টাকা ফেরত দিচ্ছেন না। তখন চাপ পড়ে ম্যানেজারের ওপর। এ জন্য ম্যানেজার ঝুঁকিও নেন না। অর্থাৎ জামানত হিসেবে জমি, মাঠ যা আছে কিছু একটা দিয়ে গ্রাহককে টাকা নিতে হবে। তিনি তো দেশের অবস্থা জানেন। এ দেশে শয়তানের হাড্ডির অভাব নেই।

এশিয়ানমেইল২৪.কম : কৃষি ব্যাংকের অনেক পুরনো অভিযোগ, দালাল ছাড়া ঋণ পাওয়া যায় না।

মোহাম্মদ ইসমাইল : এই দেশের মানুষের সমস্যা হলো, তিনি ছাড়া কোনো লোক নেই। কৃষি ব্যাংকে দালাল নেই তা বলবেন না, আছে। তিনি যে পরিবর্তন করতে পারছেন তা নয়। এখানে দালাল কেন আসে সেটা খতিয়ে দেখতে হবে। যেমন- রুরাল এরিয়াতে যারা ঋণ নেয়, দেখা যায় তার জমির কাগজপত্র ঠিক নেই। দাদার আমল থেকে সে জমি চাষ করে খাচ্ছে কিন্তু মিউটেশন করা নেই। বেশিরভাগই লেখাপড়া জানেন না। তারা ম্যানেজারের কাছে যেতে ভয় পান। মনে করেন, ম্যানেজার বুঝি ব্রিটিশদের সর্বশেষ প্রজাতি। যখনই কেউ লোন নিতে আসবেন, ম্যানেজার কিন্তু জমির মিউটেশন ছাড়া দেবেন না। ব্যবসা-বাণিজ্য নিজের নামে থাকলেও ম্যানেজার এ সব বিষয় বেশি চেক করেন। তখন তাদের সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যেতে হয়। সেখানেই মহুরি বা দালালদের সঙ্গে দেখা হয়। তারাই মূলত দালাল। তবে মানুষ ধীরে ধীরে শিক্ষিত হচ্ছেন বলে দালালের দৌরাত্ম্যও কমছে। আরেকটা ব্যাপার হলো, দালাল সব সময়ই হয় শাসক দলের স্থানীয় পাতিনেতারা। কৃষকও মনে করেন, এদের ছাড়া বোধ হয় কাজ হয় না। ম্যানেজারের কাছেও এ সব নেতা সহজে চলে যান। তবে দালালমুক্ত করতে তারা পদক্ষেপ নিয়েছেন।

এশিয়ানমেইল২৪.কম : কী পদক্ষেপ নিয়েছেন?

মোহাম্মদ ইসমাইল : কৃষকের ঋণ কীভাবে আরও সহজতর করা যায়, সে বিষয়ে একটি কমিটি করা হয়েছে। অল্প সময়ে কী করে ঋণ দেয়া যায় তারা সেটি দেখবেন। তারা গ্রাহকদের বলছেন, সরাসরি ব্যাংকের ম্যানেজারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। ব্যাংকের শাখাগুলোকে সুসজ্জিত ও পরিপাটি করে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের অতিরিক্ত কাজ করতে হয়। যেমন- বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, বিদ্যুৎ বিল গ্রহণ ও সেনাবাহিনীর বেতন দেয়ার কাজ করতে হয়। এর জন্য তারা কোনো পারিতোষিক পান না। কিন্তু এরাই ব্যাংকটাকে আটকে রাখে। রাষ্ট্রের কাজ করতে গিয়ে তাদের মূল কাজটাই বাধাগ্রস্ত হয়। কৃষি ব্যাংক যে শুধু কৃষিঋণ নিয়ে কাজ করে তা কিন্তু নয়, এর বাইরেও অনেক কাজ করে। তাছাড়া এ ব্যাংকে ঋণ নিতে এলেও মানুষ আইনকানুন মানার বিষয়ে সতর্ক হয় না। এনজিওগুলো ঋণ দিয়ে ২৫-২৭ শতাংশ হারে সুদ নিয়ে থাকে। এ জন্য তারা কোনো কিছু দেখতে চায় না। কৃষি ব্যাংক সুদ নেয় ৯ শতাংশ। এনজিওরা তাদের চেয়ে তিন গুণ বেশি নেয়। তাদের এখান থেকে নিতে পারে না, কারণ তাদের কাগজপত্র প্রস্তুত নেই। কৃষকের কিন্তু উচিত তার নিজ স্বার্থে কাগজ ও জমির দলিলগুলো সঠিকভাবে প্রস্তুত করা।

এখন তাদের পরিকল্পনা আছে, ফারমার্সদের ডাটা ব্যাংক বানানো। কৃষকের ন্যাশনাল আইডি কার্ডের সঙ্গে ইলেকশন কমিশনের একটা যোগসূত্র আছে। তাদের কাছ থেকে সব তথ্য পেয়ে যাবেন। তাদের অনলাইন ব্যাংকিংও আছে। যারা লোন নেবেন তাদের কাছেও তাদের অনুরোধ, ‘আপনারা সহজভাবে আসেন। একটা কথা আছে- ‘ন্যায় বিচার যদি পেতে চান ইউ মাস্ট কাম ক্লিন।’

এশিয়ানমেইল২৪.কম : সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

মোহাম্মদ ইসমাইল : এশিয়ানমেইল২৪.কমকেও ধন্যবাদ।

জেডসি