ঢাকা: ২০১৮-১১-১৪ ২১:৪৮

Khan Brothers Group

গরম হচ্ছে রাজনীতির হাওয়া!

এশিয়ানমেইল২৪.কম

প্রকাশিত : ০৪:৪৫ পিএম, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ মঙ্গলবার

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

বিভুরঞ্জন সরকার: দেশের রাজনীতিতে গরম হাওয়া বয়ে যাওয়ার লক্ষণ স্পষ্ট হচ্ছে। নির্বাচন এলে আমাদের দেশে রাজনীতির মরা গাঙেও বান ডাকে। সবচেয়ে বিতর্কিত ও সমালোচিত লোকটিও নির্বাচনে দাঁড়িয়ে মনে করেন ভোটে তার জেতার সম্ভাবনা শতভাগ। আমাদের দেশের ভোটাররা মোটা দাগে দুই ভাগে বিভক্ত। অর্থাৎ যেকোনো দুটি দলের প্রার্থীর জয়লাভের সম্ভাবনা থাকে। তার মানে আবার এটা নয় যে, দল হলেই হবে। দল হতে হবে হয় আওয়ামী লীগ, না হয় বিএনপি। সিপিবি, বাসদ, বিকল্পধারা, গণফোরাম এসব দলের কিছু যে ভোট নেই তা নয়। তবে সে ভোটে নির্বাচনে জেতা যায় না। আওয়ামী লীগ, বিএনপির বাইরে জাতীয় পার্টি এবং জামায়াতেরও কিছু ভোট আছে। জাতীয় পার্টি একসময় পাওয়ার পার্টিও ছিল। জামায়াত এককভাবে ক্ষমতায় না গেলেও তারা ক্ষমতার জুনিয়ার পার্টনার ছিল। বিএনপির বদান্যতায় জামায়াত সরকারে অর্থাৎ মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পেয়েছিল।

আমাদের দেশের জনমনস্তত্ত্বের কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। আমরা অনেক সময় সত্যের চেয়ে মিথ্যাকে বেশি বিশ্বাস করি। বাস্তবের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেই কল্পনাকে। অনেক সময় প্রকৃত ঘটনার চেয়ে ধারণা আমাদের কাছে প্রাধান্য পায়। কাউকে দেবতার আসনে বসাতে যেমন আমাদের সময় লাগে না, তেমনি মুহূর্তের মধ্যে তাকে অপদেবতা বানাতেও আমাদের সক্ষমতা প্রশ্নাতীত। আমরা একই কাজের দুই রকম মূল্যায়ন করি নিছক নিজেদের সুবিধা বিবেচনা করে। প্রায় একই প্রক্রিয়া-পদ্ধতিতে ক্ষমতা দখল করলেও জিয়াউর রহমান আমাদের কারো কারো কাছে ‘গণতন্ত্রী’ এবং এরশাদ হলেন স্বৈরাচারী। বিএনপি হলো গণতান্ত্রিক দল আর জাতীয় পার্টি হলো স্বৈরাচারী দল।

যারে দেখতে নারি, তার চলন বাঁকা। কাজেই আমাদের রাগ কিংবা অনুরাগ কোনোটাই সবসময় খুব যুক্তিপূর্ণ বা বিবেচনাপ্রসূত হয় না। রাজনীতির প্রতি আমাদের প্রচণ্ড আগ্রহ। রাজনীতি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা আমরা পছন্দ করি। রাজনীতি আমারও প্রিয় বিষয়। দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি নিয়েই লেখালেখি করি। বলা যায়, রাজনীতি নিয়ে লিখেই জীবিকা নির্বাহ করি। তবে মাঝে মাঝে বিরক্ত লাগে। একঘেয়ে লাগে। লিখতে বসলে মনে হয় একই বিষয় নিয়ে আর কত লেখা যায়। কিন্তু না লিখে তো উপায় নেই। এটাই যে পেশা।

নির্বাচনকে সামনে রেখে জোট-ঘোট বহু কিছু হচ্ছে। আগে ছিল দেশে রাজনৈতিক দলের ছড়াছড়ি গড়াগড়ি। এখন শুরু হয়েছে জোট জমানা। একার শক্তিতে পেরে উঠতে পারার আত্মবিশ্বাসের অভাব থেকেই শুরু হয়েছে জোটের রাজনীতি। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে একটি জোট আছে। আছে বিএনপির জোট। আবার এরশাদ সাহেবেরও একটি ইয়াব্বড় জোট আছে। আছে বামপন্থিদের জোট, ধর্মপন্থিদের জোট। জোট নিয়ে, ভোট নিয়ে কাড়াকাড়ির শেষ নেই। রাজনীতিকে বলা হয় এখন লাভজনক ব্যবসা। এই ব্যবসায় নাকি কম পুঁজিতে লাভ বেশি। আগে রাজনীতিবিদদের কেউ কেউ কিছু ব্যবসা করতেন, এখন রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদেরই প্রাধান্য। রাজনীতিকে আবার খেলার সঙ্গেও তুলনা করা হয়। প্রায়ই শোনা যায় ফাঁকা মাঠে গোল দেওয়ার কথা। বা ফাঁকা মাঠে গোল দিতে দেওয়া হবে না ইত্যাদি হুঙ্কার।  রাজনীতির মাঠে কিছু আছেন নিয়মিত খেলোয়াড়, কিছু আবার আছেন মৌসুমি বা সিজনাল। বিশেষ বিশেষ সময়ে বা উপলক্ষে এই মৌসুমি খেলোয়াড়দের তত্পর, অতি-তত্পর হতে দেখা যায়। যেমন- একাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নানা কিসিমের রাজনৈতিক তত্পরতা শুরু হয়েছে। নামজাদা, নামহীন সব ধরনের প্লেয়ারই এখন জায়গা খুঁজছেন। এদের সবাই যে মাঠে আছেন তা-ও নয়। মাঠের বাইরেও কেউ কেউ খেলার চেষ্টা করছেন।

ড. কামাল হোসেন, ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী দেশের দুই প্রবীণ রাজনীতিবিদ। তাদের কাছে মানুষের অনেক আশা-ভরসা। তারা সজ্জন, শিক্ষিত মানুষ হিসেবে পরিচিত। একজনের আইনে অগাধ পাণ্ডিত্য। আরেকজন চিকিত্সাশাস্ত্রে বিরাট অভিজ্ঞতার অধিকারী। একজন পেয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্নেহ-সান্নিধ্য। আরেকজন রাজনীতির পাদপ্রদীপের নিচে এসেছেন জিয়াউর রহমানের হাত ধরে। দুইজনকে ঠিক এক মেরুর লোক বলা যাবে না। একজন বঙ্গবন্ধু ভক্ত। আরেকজন জিয়ার। রাজনৈতিক চিন্তা-অবস্থানের দিক থেকেও দুইজনের মতপার্থক্য প্রবল হওয়ারই কথা। কিন্তু এই দুই নেতা সম্প্রতি দেশের রাজনীতিতে আলোচনার ঝড় তুলেছেন। তারা একটি বৃহত্তর ঐক্য তত্পরতা শুরু করেছেন। ২২ সেপ্টেম্বর মহানগর নাট্যমঞ্চে একটি সমাবেশের মধ্য দিয়ে এই ঐক্য চেষ্টার যাত্রা শুরু হয়েছে। বিএনপির মহাসচিবসহ কয়েকজন নেতা ওই সমাবেশে উপস্থিত থেকে এবং এই ঐক্য চেষ্টায় যুক্ত থাকার অঙ্গীকার করে এর গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছেন। সৌখিন ও বিলাসী রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বিষয়টির প্রতি যতটা আগ্রহ দেখাচ্ছেন, বাস্তবে সরকারবিরোধী এই ঐক্য কতটা ফলদায়ক হবে সেটা নিয়ে সংশয় প্রকাশের সুযোগ রয়েছে।

এই ঐক্য চেষ্টা দেশের রাজনীতিতে গুণগত কোনো পরিবর্তন আনবে কি না বা নতুন কোনো মাত্রা যোগ করবে কি না, সেটা এখনই বলা যাবে না। এই ঐক্য চেষ্টাকারীরা কি বিএনপির সুরে কথা বলবে? যত দোষ নন্দ ঘোষ বলে সব দায় সরকারের ওপর চাপিয়ে দিয়ে নিজেরা ধোয়া তুলসি পাতা সাজার চেষ্টা করবেন? আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করাই কি হবে এই ঐক্যের প্রধান লক্ষ্য? যদি তাই হয় তাহলে এই ঐক যে কোনো সুফল বয়ে আনবে না— এটা বলার জন্য জ্যোতিষী হওয়ার প্রয়োজন নেই।

নির্বাচন আসছে। এই নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও সুন্দর করার জন্য রাজনৈতিক শক্তিকেই সহযোগীর ভূমিকা পালন করতে হবে। কেবল নির্বাচন কমিশনের পক্ষে দেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান করা সম্ভব নয়। কোনো রকম পূর্বশর্ত না দিয়ে সব রাজনৈতিক দল যদি আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে তবেই নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হবে বা বলা যায় নির্বাচনের একটি সুন্দর পরিবেশ তৈরি হবে। সব রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ না নিলে এমনিতেই সুষ্ঠু নির্বাচনের সম্ভাবনা কমে যায়। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে সে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না, গ্রহণযোগ্য হবে না— এই ধরনের একটি আবহ তৈরি করা কারোই উচিত নয়। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো যখন নির্বাচন থেকে দূরে থাকার অজুহাত খোঁজে তখনই সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়ে যায়।

বৃহত্তর নতুন রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে উঠুক। দেশে সুস্থধারার রাজনীতি ফিরে আসুক, এটা এখন আমাদের প্রধান চাওয়া। পুরাতন বোতলে নতুন মদ ঢেলে পরিবর্তন নয়, পরিবর্তন আনতে হবে রাজনীতির সদরে-অন্দরে। নির্বাচন হলো জয়-পরাজয়ের খেলা। আমি জিতলে ভালো নির্বাচন, আর আমি হারলেই খারাপ- এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। নির্বাচনে যদি সব দল অংশ নেয় এবং একটি চ্যালেঞ্জিং নির্বাচন দেশে হয়, তাহলে আর কেউ আমাদের দুষতে পারবে না এবং কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবে না। (সংগৃহীত)

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক