ঢাকা: ২০১৯-০৩-২২ ৩:৪২

Khan Brothers Group

ভোট হোক সুন্দর ও উৎসবমুখর

এশিয়ানমেইল২৪.কম

প্রকাশিত : ১১:১৫ এএম, ২৯ ডিসেম্বর ২০১৮ শনিবার

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

ড. এম এ মাননান: দেশ এগিয়ে চলছে নাকি স্থবির হয়ে আছে, তা দেশের কিছু মতলবি বুদ্ধিজীবী এবং পথহারা পথিক না বুঝলেও সারা বিশ্ব ঠিকই বুঝেছে। মাত্র কয়েকদিন আগেই যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘স্টাডি সার্কেল’ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বিগত নয় বছরের উন্নয়নের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে : বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের পথে স্বর্ণালি যাত্রাপথে- ‘বাংলাদেশ : গোল্ডেন জার্নি টু ডেভেলপমেন্ট’। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০০৯ সালে সরকার গঠন করার পর উন্নয়নের স্বপ্নদর্শী ও রূপকার শেখ হাসিনার সাহসী উদ্যোগ ও প্রগতিশীল নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলেছে।

জাপানের ‘নিক্কি এশিয়ান রিভিউ’ বলেছে, বাংলাদেশ একটি সফলতার গল্প (সাক্সেস স্টোরি)। বিগত এক দশকের উন্নয়ন মূল্যায়ন করতে গিয়ে পত্রিকাটি লিখেছে : এক দশক ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার বড় হচ্ছে। ২০০৯ সালের পর থেকে বাড়তে বাড়তে মাথাপিছু আয় তিনগুণ বেড়েছে। ক্ষুধা জয় করে খাদ্যে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে বাংলাদেশ। সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা এ কৃতিত্বের দাবিদার বলে পত্রিকাটি উল্লেখ করেছে।

জাপানের আরেকটি প্রভাবশালী সাময়িকী ‘এশিয়ান রিভিউ’ একই সুরে বাংলাদেশকে পৃথিবীর ‘অন্যতম অর্থনৈতিক সফলতার কাহিনী’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। অতি সম্প্রতি ১৯৭১-এ বাংলার বুকে লজ্জাকর পরাজয়ের গ্লানিমাখা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানও বাংলাদেশের অভাবিত উন্নয়নের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেই ক্ষান্ত হননি, তিনি আক্ষেপ করে বলেছেন, এককালে বড় মাপের বোঝা বলে বিবেচিত পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমানের বাংলাদেশ) এখন দূরদর্শী চিন্তার জন্য সবকিছুতেই এগিয়ে।

নবগঠিত দেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে টিটকারী দেয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন প্রকাশ্যে বাংলাদেশকে সমীহের চোখে দেখছে। ইংল্যান্ডের প্রভাবশালী সাময়িকী ‘দি ইকোনমিস্ট’ বাংলাদেশের উন্নয়নকে বিস্ময়কর বলে অভিহিত করেছে। বিশ্ববাসী জোরেশোরেই বলছে, বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের ছাব্বিশতম বৃহৎ অর্থনীতি হিসেবে আবির্ভূত হবে।

সারা বিশ্বে হৈচৈ ফেলে দেয়া একটি ছোট্ট দেশ নজিরবিহীন অগ্রগতি অর্জন করেছে যে ব্যক্তি ও দলের নেতৃত্বে, তাকে এবং তার দলকে এবার নির্বাচিত না করে দেশবাসী কাকে নির্বাচিত করবে? অন্যরা কোন্ মুখে ভোট চায়- যারা প্রায় দুই যুগ ক্ষমতায় থেকেও জনগণকে কোনো সুখবর শোনাতে পারেনি, খাম্বা দিলেও বিদ্যুৎ দিতে পারেনি, উত্তরবঙ্গের মঙ্গা দূর করতে পারেনি, ক্ষুধাক্লিষ্ট মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারেনি, ডিজিটাল শব্দটা মুখে পর্যন্ত আনতে সাহস পায়নি, থরথর করে বুক কাঁপার কারণে আন্তর্জাতিক ফাইবার অপটিক্যাল লাইনে সংযুক্ত হয়ে জনগণকে ইন্টারনেট সুবিধা দিতে পারেনি, বিত্তশালীদের লাখ টাকার কানেকশন ফি’র মোবাইল ফোন দিলেও স্বল্পবিত্তদের কথা ভাবারও ফুরসৎ পায়নি, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর বিষয়টি মাথায়ও আনেনি, রাষ্ট্রের শীর্ষে নারী নেতৃত্ব থাকার পরও নারীর উত্থানের বিষয়টি আমলে আনেনি (লিঙ্গবৈষম্য হ্রাস তো অনেক দূরের বিষয়), মেগা প্রকল্প কী তা ধারণায়ও আনতে পারেনি আর স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের ব্যাপারটি তো ছিল আকাশ-কুসুম কল্পনারও বাইরে (যারা বোঝেই না কক্ষপথ কী, যার ফলে ‘সঠিক কক্ষপথের’ সন্ধানে বের হয়েছে ইশতেহারের মাধ্যমে)? দুই কোটি নবীন ভোটার আর পাঁচ কোটি নারী ভোটার তাদের কেন প্রথম ভোটটি দেবে- যারা ক্ষমতায় থেকেও ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে, সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, লুটপাট-রাহাজানি-নির্যাতন-সম্ভ্রমহানি করে জোতজমি-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখল করেছে আর দেশত্যাগে বাধ্য করেছে, নিরীহ মানুষকে বোমা মেরে আগুন দিয়ে হত্যা করেছে, রাজধানীতে তাণ্ডব চালিয়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস করে জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়েছে এবং সর্বোপরি এত কষ্টে অর্জিত বাংলাদেশকে অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করার অপচেষ্টা চালিয়েছে?

ত্রিশ লাখ শহীদ, দুই লক্ষাধিক মা-বোনের লুণ্ঠিত আব্রু আর নির্যাতিত-নিপীড়িত-সম্পদহারা স্বজনহারা কয়েক কোটি মানুষের অব্যক্ত কান্নার বিনিময়ে প্রাপ্ত মুক্ত-স্বাধীন দেশের বুকে দাঁড়িয়ে সাম্প্রদায়িক শক্তি, হন্তারক আর নির্যাতকদের বা তাদের দোসর-বংশধরদের নির্বাচিত করার মতো ভুল এ প্রজন্ম করবে না, এ বিশ্বাস আমাদের আছে। বিকৃত ইতিহাসের পাতার আড়ালে লুকিয়ে রাখা সত্য তো ইতিমধ্যেই বেরিয়ে এসেছে। এ সত্যই নবপ্রজন্মকে পথনির্দেশ দেবে, তাদের বিবেককে নাড়া দেবে। তাই নতুন প্রজন্মের ওপর আস্থা রাখি আমরা। তারা সচেতনভাবেই স্বাধীনতাবিরোধী থেকে শুরু করে তাদের বংশধরসহ যুদ্ধাপরাধী, পাকি প্রেমিকদের কখনও সমর্থন দেবে না, এ রকম ভুল তারা করতেই পারে না। প্রগতিশীলদের ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করে প্রগতির পথে এগিয়ে চলা দেশের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতেই হবে আলোকিত-সুন্দর-উজ্জ্বল জীবনের স্বার্থে।

নতুন প্রজন্মসহ নবীন-প্রবীণ সবাইকেই সাবধান থাকতে হবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে অনবরত প্রচারিত মিথ্যার বিষয়ে। অজস্র মিথ্যা তথ্য প্রচারিত হচ্ছে ইন্টারনেট দুনিয়ায়; উদ্দেশ্য বিভ্রান্তি ছড়ানো। কৌশলি বাচনভঙ্গি দিয়ে ভোটারদের মনোজগতে ঘুণ ধরানোর চেষ্টা চলছে। একটি সূত্র মতে, নির্বাচন ঘিরে গুজব ছড়াচ্ছে শতাধিক ফেসবুক পাতা, ইউটিউব চ্যানেল ও অনলাইন নিউজ পোর্টাল আর এগুলো করছে দেশে-বিদেশে প্রায় বিশ হাজার অনলাইন একটিভিস্ট। গুজব ছড়ানোর জন্য অর্থও খরচ করা হচ্ছে বেশুমার। অপপ্রচার আসছে দেশের ভেতর থেকে, আসছে বাইরে থেকেও। হাজারও ‘গোয়েবল্স’ এখন সক্রিয় ভোটের ময়দানে- ভূমিতে, ইথারে। এসব গোয়েবল্স মিথ্যাকে বারবার প্রচার করে সত্য বানানোর অপচেষ্টায় লিপ্ত। ইতিহাস সাক্ষী, প্রচারমন্ত্রী গোয়েবল্সকে দিয়ে বারবার মিথ্যা তথ্য প্রচার করে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত জার্মানির একনায়ক হিটলার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জার্মানিকেই শেষ পর্যন্ত বিধ্বস্ত করে দিয়েছিল- হয়েছিল বুমেরাং। একাদশ নির্বাচন উপলক্ষে বাংলাদেশে যে গোয়েবল্সরা মিথ্যা প্রচারে মাঠে নেমেছে, তারা এককালের ব্যর্থ রাষ্ট্রপরিচালকদের অনুচর। সাবধান থাকতে হবে এসব কুচক্রী-গোয়েবল্সের কুমন্ত্রণা থেকে। এদের মূল উদ্দেশ্য স্বাধীনতাবিরোধীদের আবার ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা, নিজ ভূমে প্রত্যাখ্যাত মওদুদির প্রবর্তিত মৌলবাদকে প্রতিষ্ঠিত করা এবং দেশকে আরেকটা ‘পাকিস্তান’ বানানো। নির্বাচনটা এ কারণে এবার অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কোনো দেশপ্রেমিকই চায় না ২০২১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তীতে লাল-সবুজের পতাকায় কোনো স্বাধীনতাবিরোধী বা তাদের দোসরদের হাত লাগুক। সাগরসম রক্তের বিনিময়ে প্রাপ্ত এ পতাকার অবমাননা আমরা সচেতন নাগরিকরা একেবারেই কামনা করি না।

চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি, এদেশে মীরজাফর চরিত্রের খন্দকার মোশতাক একমাত্র ‘মোশতাক’ নয়, পৌরাণিক কাহিনীর ভয়ংকর দৈত্য রক্তবীজের বংশধরদের মতো মোশতাকের সংখ্যা বেড়েছে শাখা-প্রশাখায়। ভোটের অঙ্গনে এখন অনেক মোশতাকের আবির্ভাব। পথহারা এসব মোশতাক কৌশলিক আচরণ দিয়ে ধোঁকা দেয়ার চেষ্টা করছে সারা দেশে। তারা শুধু ইমান বিক্রি করেনি, বিক্রি করেছে নিজেদের গায়ের মুক্তিযোদ্ধার বস্ত্রটুকুও। এদেরও চিনতে হবে, রুখতে হবে। গোয়েবল্সরা এদের পক্ষ হয়েই কাজ করছে। মানুষের কল্যাণ সাধন এদের কাজ নয়, এদের লক্ষ্য দেশ থেকে স্বাধীনতার চেতনাকে মাটিচাপা দিয়ে ভিন্ন দেশের পরামর্শে এদেশটাকে অন্যের বশীভূত করে রেখে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করা। এরা ক্ষমতালোভী, জনকল্যাণলোভী নয়। এরা আছে পেছনের দরজার সন্ধানে। সাবধান হতে হবে এদের বদ মতলবের ব্যাপারে। এরা নির্বাচন বানচালের চেষ্টাও করতে পারে। প্রায় প্রতিদিন তাদের মুখে শোনা যায় উসকানিমূলক কথা। আসুন নবীন-প্রবীণরা, এদের প্রতিহত করুন রাজনৈতিকভাবে; দোলাচলে থাকার সুযোগ নেই। ব্যবহার করতে হবে শুধুই মগজাস্ত্র। কারও বিপক্ষে বাধা সৃষ্টি নয়, আঘাত নয়, বাঁকা কথা নয়, অশোভন আচরণ নয়, হুল ফোটানো বচন নয়, হামলা নয়, অসহিষ্ণুতা নয়, বাকস্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে অন্যের চরিত্র হনন নয়। থাকবে প্রতিপক্ষের সঙ্গে শ্রদ্ধাপূর্ণ সম্পর্ক, পারস্পরিক মমত্ববোধ, প্রতিবেশীমূলক আচরণ। কাজ হবে মগজাস্ত্র দিয়েই। আদর্শের অবস্থানে থেকেই ‘যুদ্ধ’ করতে হবে অপশক্তির বিরুদ্ধে।

কামনা করি, নির্বাচন যেন উৎসবের রং ছড়ায়। নির্বাচনের আগে-পরে বাংলাদেশ যেন ২০০১ সালের ‘অভয়নগর’ কিংবা ২০১৪ সালের ‘মালোপাড়া’ না হয়। হারলে যেন খেলোয়াড়সুলভ মনোভাব নিয়ে হার কবুল করে নিই। জিতলে যেন সরাকে ধরাজ্ঞান না করি (এমনটি করে অতীতে অনেকেই ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে)। আজকের হার যেমন কালকের জেতার সিঁড়ি, যে সিঁড়িটিকে জেতার যোগ্য করে সাজাতে হবে আপন আচরণ দিয়ে; তেমনি আজকের জিত কালকের জন্য জনগণের হৃদয়ে ঠাঁই করে নেয়ার সুযোগ, যে সুযোগ কাজে লাগিয়ে সবার হৃদয় জয় করে পাকাপোক্ত করে নিতে হবে আপন রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ। আগামীর জেতা নির্ভর করে আজকের আচরণ আর আগত দিনগুলোর কর্মকাণ্ডের ওপর। ভুলে যেন না যাই, দেশটা আমাদের সবার অনেক ভালোবাসার, যে দেশের মাটির বুকে আমরা মাথা পেতে শুই, যে দেশের কাদামাটিতে মাখামাখি হয়ে শৈশব কাটাই, যৌবনে যেখানে স্বপ্ন বুনি, বার্ধক্যে যে দেশের সোঁদামাটির মিষ্টিগন্ধে আকুল হয়ে জীবনের শেষ দিনগুলোর হিসাব কষতে থাকি, আর যে দেশের মাটিতে একদিন পরিপূর্ণ জীবনটাকে সমর্পণ করে দিই। এমন প্রিয় দেশের সম্মান আর ভবিষ্যৎ রক্ষা করতে হবে আমাদেরই, সজ্ঞানে সচেতনভাবে।(সংগৃহীত)

ড. এম এ মাননান : শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট; উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

এ/কে