ঢাকা: ২০১৮-১২-১৫ ৯:১৬

Khan Brothers Group

সুষ্ঠু নির্বাচন এবং কিছু প্রস্তাবনা

এশিয়ানমেইল২৪.কম

প্রকাশিত : ০১:৫১ পিএম, ২৬ নভেম্বর ২০১৮ সোমবার

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

ড. শহীদুল ইসলাম: ক্লাস টুতে পড়াকালীন একবার আমাদের গ্রামে সপ্তাহব্যাপী ম্যাজিকের অনুষ্ঠান হয়েছিল। প্যান্ডেলের মাঝে রাতের বেলা এ ম্যাজিক দেখানো হতো। অনেকে দলে দলে প্রতিদিন এ ম্যাজিকে অংশ নিত। নারী-পুরুষ, ছেলে-বুড়ো সবাই একযোগে ম্যাজিক দেখা শুরু করল।

আমিও ম্যাজিক দেখার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করলাম আমার বাবার কাছে। বাবা বললেন, ম্যাজিক দেখা ভালো নয়, সেখানে যা দেখানো হয় তা সত্য নয়, মানুষকে ধান্দা লাগানো, জোয়াচুরি আর প্রতারণা ছাড়া এটা কিছুই নয়। মোটকথা, ম্যাজিক মানেই হচ্ছে লুকোচুরি। তাই এমন কোনো ম্যাজিক দেখা ঠিক নয়, যা মরীচিকার মতো মিথ্যা আশ্বাসে ভরপুর।

আমাদের গ্রামসহ আশপাশের দশ-বিশ গ্রামের লোকজন প্রতিদিন ভিড় জমাতো ম্যাজিক দেখার জন্য। একটি দিনের জন্যও আমার বাবা আমাকে ম্যাজিক দেখতে দেননি। অনেক অনুনয়-বিনয় করেও কোনো কাজ হয়নি। শেষ পর্যন্ত আমার মেজো জ্যাঠা আমাদের বাড়িতে এলেন। তখন আর মাত্র একদিন ম্যাজিক দেখানো বাকি ছিল।

জ্যাঠা আমার বাবাকে একটু কড়া ভাষায় বললেন, এই ছোট ছোট ছেলেরা ম্যাজিক তো দেখতেই পারে, ওরা একটু আনন্দ করুক না, একদিনের জন্য হলেও ওদের ম্যাজিকটা দেখতে দাও। বাবার মন কিছুটা গলে গেল। অনুমতি পাওয়া গেল। ওইদিন রাতে ম্যাজিক দেখার জন্য দুই টাকা দিয়ে একটি টিকিট নিলাম। ম্যাজিকে বেশ কয়েকটি পর্ব উপভোগ করলাম।

সর্বশেষ দেখলাম, একটি কাঠের বাক্স মঞ্চের এক পাশে সেট করা। ম্যাজিশিয়ান প্রথমে সবাইকে বাক্সটা খুলে দেখালেন তার মাঝে কিছু আছে কিনা। দেখা গেল কিছুই নেই। তবে বাক্সের বিপরীত দিকে মঞ্চের নিচ দিয়ে একজন মানুষ অনায়াসে যাওয়া-আসার সুড়ঙ্গ রাখা হয়েছিল, যাতে করে দর্শকদের ম্যাজিকের নামে সহজে ধোঁকা দেয়া যায়।

ম্যাজিশিয়ান ম্যাজিক শুরু করলেন। দর্শক-শ্রোতাদের মনোযোগ আকর্ষণ করলেন। ইতিমধ্যে একজন বৃদ্ধ লোককে মঞ্চের পেছন দিক দিয়ে বাক্সের মধ্যে ঢোকানো হল সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে। তারপর খোলা হল বাক্সটির উপরের ঢাকনা। সঙ্গে সঙ্গে একজন বৃদ্ধ লোক লেপ-কাঁথা গায়ে জড়ানো অবস্থায় উঠে দাঁড়িয়ে গেল।

শ্রোতারা সবাই অবাক হয়ে গেল। এটা কীভাবে সম্ভব! সবাই উপভোগ করল ম্যাজিকের আনন্দ। কিন্তু এটা আসলে কোনো অলৌকিক ঘটনা বা ম্যাজিক নয়। এটা হচ্ছে মানুষকে বোকা বানিয়ে ধোঁকায় ফেলে দেয়ার একটা কৌশল। আর এটাই ম্যাজিশিয়ানের দৃষ্টিতে ম্যাজিক। অনেকেই ম্যাজিশিয়ানের এ চাতুর্যময় কৌশল বুঝতে পারল- এসব আইওয়াশ ছাড়া কিছুই নয়।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে দেশবাসী এমন কোনো ম্যাজিকের সম্মুখীন হচ্ছেন কিনা তা নিয়ে সংকট এখনও কাটেনি। এ সংকট সফলভাবে নিরসনের জন্য সরকারি দল বা জোট এবং বিরোধী দলে অবস্থানকারী সব দলকে আন্তরিক হতে হবে। ক্ষমতাসীন দল যেমন নিজেদের জায়গায় অনড়, বিরোধী ফ্রন্টের দলগুলোও তাদের অবস্থানে অনড় রয়েছে এখনও।

কেউ বলছেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সংসদ ভেঙে দিতে হবে এবং সাত দফা মেনে সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে। অপরপক্ষ বলছে, সংসদ ও সরকার বহাল রেখেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ অবস্থায় নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের সিডিউল ঘোষণা করেছে। একদফা সিডিউল পেছানোও হয়েছে। কিন্তু জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এতে সন্তুষ্ট নয়। তাই তারা দ্বিতীয় দফা নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করে আবারও তিন সপ্তাহ নির্বাচন পেছানোর দাবি জানিয়েছে।

ওইদিন আওয়ামী লীগও দাবি জানিয়েছে, এক ঘণ্টার জন্যও নির্বাচন পেছানো যাবে না। বড় দুটি দলের এ ধরনের পাল্টাপাল্টি দাবিতে নির্বাচন কমিশনকে কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে বলে দৃশ্যমান। এটা একটি বড় সংকট। এ সংকট উত্তরণ ও নিরসনে ম্যাজিকের ভূমিকা পালন না করে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে বাস্তবতার নিরিখে কাজ করতে হবে। এ ব্যাপারে সব রাজনৈতিক দল, সরকার ও নির্বাচন কমিশনের প্রতি আমার কিছু প্রস্তাবনা পেশ করছি:-

সরকারের ভূমিকা:

১. নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা: গণতান্ত্রিক উপায়ে সরকার পরিবর্তনের মাধ্যম হচ্ছে নির্বাচন। নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ তাদের পছন্দমতো প্রার্থীকে বাছাই করার সুযোগ পায়। এজন্য নির্বাচন হতে হবে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ। আর নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করার প্রধান দায়িত্ব সরকারের।

২. সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা: একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে হলে সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারের নিরপেক্ষ আচরণ অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনকে অত্যন্ত নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। যদি নির্বাচনকালীন সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে, তাহলে কোনোভাবেই সরকারের সুবিধা হয় এমন কোনো নির্দেশনা অনুযায়ী নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না।

৩. সংসদ ভেঙে দেয়া: সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য জরুরি হচ্ছে সংসদ ভেঙে দেয়া এবং ক্ষমতাসীন দলের পদত্যাগ করা। কারণ কোনো দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন বাংলাদেশে সম্ভব নয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস সেটাই সাক্ষ্য দেয়। ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদের অধীনে নির্বাচন, ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচন এবং ২০০১ সালে ১ অক্টোবর বিচারপতি লতিফুর রহমানের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচন তার জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ।

এসব নির্বাচন সংসদ ভেঙে দেয়ার কারণে নিরপেক্ষ হয়েছে এবং জনগণ যে দলকে ভোট দিয়েছে সে দল সরকার গঠন করে দেশ শাসন করেছে। তবে যারা সংসদ ভাঙা যাবে না বলে সংবিধানের রেফারেন্স দিচ্ছেন, তাদের শুধু সংবিধানের ১২৩-এর (ক) ধারা নয়, (খ) ধারাও পড়ার অনুরোধ করব। অনুচ্ছেদটি এখানে তুলে ধরা হল: ১২৩(৩) ধারায় বলা হয়েছে; সংসদ সদস্যদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে-

(ক) মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভাঙিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙিয়া যাইবার পূর্ববর্তী নব্বই দিনের মধ্যে।

এবং অপরটিতে বলা হয়েছে;

(খ) মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভাঙিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙিয়া যাইবার পরবর্তী নব্বই দিনের মধ্যে। অর্থাৎ, সংবিধানে দুটি অপশনই বিদ্যমান। আলোচনা সাপেক্ষে যে কোনো একটি গ্রহণ করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্ব অনেক বেশি। তাই সমস্যা সমাধানে তাদের ভূমিকা অগ্রগামী হতে হবে।

৪. সব দলের সমান সুযোগ প্রদান করা: নির্বাচনকালীন সব দলকে সমান সুযোগ প্রদান করা দায়িত্ব পালনকারী সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের গুরুদায়িত্ব। সব দল যাতে সমানভাবে নির্বাচনী প্রচারে অংশগ্রহণের সুযোগ পায় সেই পরিস্থিতি ও পরিবেশ সৃষ্টি করা তাদের কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত। কোনো দল নির্বাচনী প্রচারে সব সুযোগ-সুবিধা নির্বিঘ্ন ভোগ করবে আর কোনো কোনো দল কোনো সুযোগই পাবে না তা হবে না। তাই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা সরকারের অবশ্য কর্তব্য।

নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা:

১. নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন: নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে কিনা তা নির্ভর করে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকার ওপর। নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। সংবিধানের ১২৬ ধারা অনুযায়ী সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনা করা তাদের মৌলিক দায়িত্ব। আর নির্বাচনকালীন যে সরকার দায়িত্ব পালন করবে সেই সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব হচ্ছে নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে পরিচালনার জন্য নির্বাচন কমিশনকে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করা। সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদে তা সুস্পষ্ট করে বলা হয়েছে।

কোনো রাজনৈতিক দলের ইচ্ছা পূরণ করা বা সরকারের সুনির্দিষ্ট এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা নির্বাচন কমিশনের কাজ নয়। অর্থাৎ সব অবস্থায় নির্বাচন কমিশনকে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করার মাধ্যমে জাতিকে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেয়া নির্বাচন কমিশনের প্রধান কাজ।

২. নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলার ব্যবস্থা করা: সব দল যাতে নির্বাচনের আচরণবিধি মেনে চলে সে ব্যবস্থা গ্রহণ করা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব। কোনো দল বা দলের নেতাকর্মীরা আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে তাদের কঠিন শাস্তির আওতায় আনার সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী নির্বাচন কমিশন। এক্ষেত্রে কমিশনকে নিরপেক্ষতা ঠিক রেখে ক্ষমতার যথাযথ ব্যবহার করতে হবে।

৩. সরকারের চাপে প্রভাবিত না হওয়া: সরকারের নির্বাহী বিভাগ সব ক্ষেত্রে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। তা সত্ত্বেও সরকারের চাপে নির্বাচন কমিশনকে প্রভাবিত না হয়ে নিজস্ব গতিতে নির্বাচনের সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিরপেক্ষ ও ন্যায়সঙ্গতভাবে পরিচালনা করতে হবে। কোনো দলের নির্বাচন পেছানোর দাবি যদি বাস্তবায়ন অসম্ভব হয়, তাহলে কোনো দল এক ঘণ্টাও পেছানো যাবে না বলে দাবি করলে সেটাও অসম্ভব হতে হবে। তাহলেই সঠিক নির্বাচন সম্ভব হবে।

৪. কমিশনের কথাবার্তা যৌক্তিক হতে হবে: অনেক সময় নির্বাচন কমিশনের কোনো কোনো সদস্য এমন কিছু বক্তৃতা বা বিবৃতি প্রদান করে থাকেন, যা থেকে মনে হয় নির্বাচন কমিশন অত্যন্ত অসহায় এক অবস্থায় আছে। যেমন- ‘নির্বাচন শতভাগ সুষ্ঠু হবে না’, ‘অমুক দল না এলে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না’ ইত্যাদি বক্তব্য পরিহার করে যৌক্তিক বক্তব্য দেয়া উচিত। কারণ এ ধরনের কথাবার্তায় দুর্বলতা প্রকাশ পায়।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকা: আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষ ভূমিকা নির্বাচনী সংকটের সমাধান করতে পারে। কারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দেশের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। তারা সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী তাদের দায়িত্ব পেশাদারিত্বের সঙ্গে পালন করে থাকে। তারা কোনো দলের পক্ষে কাজ করে না বলে আমার বিশ্বাস।

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে ঠিক একইভাবে যদি তারা কোনো দলের পক্ষে কাজ না করে সব দলের সঙ্গে সমান আচরণ করে এবং নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে, তাহলে কোনো সংকট তৈরি হয় না। কোনো রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী যাতে তাদের হাতে হয়রানির শিকার না হয় সেদিকে তাদের লক্ষ রাখতে হবে। তাহলেই সংকট উত্তরণ সহজ হবে এবং জাতি একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দেখার সৌভাগ্য অর্জন করবে। (সংগৃহীত)

অধ্যাপক ড. শহীদুল ইসলাম : গবেষক ও কলামিস্ট