ঢাকা: ২০১৮-০৮-১৬ ১৩:০৭

Khan Brothers Group

টাকায় ভাসছে ক্রিকেট বোর্ড-৬

১৪৬ কোটি টাকা পাচ্ছেনা বিসিবি

এশিয়ানমেইল২৪.কম

প্রকাশিত : ০২:৫৪ পিএম, ৬ অক্টোবর ২০১৭ শুক্রবার | আপডেট: ১২:০৫ পিএম, ৬ নভেম্বর ২০১৭ সোমবার

বার্ষিক সাধারণ সভাকে (এজিএম) সামনে রেখে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) গত ৭ অর্থ বছরের (২০১০-১১ থেকে ২০১৬-১৭) আয়-ব্যয়ের হিসাব বিবরণী পাঠিয়ে দিয়েছে কাউন্সিলরদের কাছে। হুদা ভাসি চৌধুরী এবং এ কাশেম এন্ড কোং নামের ২টি চার্টার্ড অ্যাকাউন্টস (সি.এ.) ফার্ম এই ৭ অর্থ বছরের নিরীক্ষা রিপোর্ট তৈরি করেছে। তাদের রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে গবেষণাধর্মী প্রতিবেদনের ৬ষ্ঠ কিস্তি প্রকাশিত হলো আজ শুক্রবার।

শামীম চৌধুরী: উন্মুক্ত নিলামে নিমবাস কমিউনিকেশন লিমিটেডের কাছে ৬ বছরের জন্য  মিডিয়া অ্যান্ড মার্কেটিং রাইটস বিক্রি করে যে স্বপ্নের জাল বুনেছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি), সে স্বপ্ন পূরণ হয়নি। ২০০৬ সালের নভেম্বর থেকে ২০১২ সালের মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশের মাটিতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ  ক্রিকেট দলের সব দ্বি-পাক্ষিক হোম সিরিজ এবং টুর্নামেন্টের সম্প্রচার ৬ বছরের জন্য সত্ত্ব বিক্রি থেকে রেকর্ড ৫৬.৮০ কোটি ডলার (৪৫৫ কোটি ৪ লাখ টাকা)আয়ের স্বপ্ন  ভঙ্গ হয়েছে। চুক্তির শর্ত পালন করেনি সিঙ্গাপুরভিত্তিক এই টেলিভিশন সম্প্রচার প্রতিষ্ঠান।

চুক্তির এই মেয়াদে অ্যালাউঅ্যাবল কস্ট (অনুমোদিত খরচ) খাতে ১৫.৩০৯ কোটি ডলার (১২২ কোটি ৪৭ লাখ ২০ হাজার টাকা) কেটে রেখেও বিসিবির পাওনা পুরোটা পরিশোধ করেনি নিমবাস!

চুক্তির মেয়াদ থাকাকালে  ৯১ কোটি ৫৪ লাখ ৪৬ হাজার ২২০ টাকা পরিশোধ না করায় চক্রবৃদ্ধি হারে দ্বিগুন বেড়ে ২০১৬-১৭ অর্থ বছর শেষে লভ্যাংশসহ  নিমবাসের কাছে পাওনা অর্থের অংক দাঁড়িয়েছে ১৮৩ কোটি ৮ লাখ ৯২ হাজার ৪৪০ টাকা! তবে চক্রবৃদ্ধি হারে দাঁড়ানো অঙ্ক নয়, লভ্যাংশ বাদ দিয়ে আসলটা আদায়ই অসম্ভব হয়ে পড়েছে বিসিবির।

২০১০-১১ ও ২০১১-১২ এই ২ অর্থ বছরে অ্যালাউঅ্যাবল কস্ট খাতে ৩৫ কোটি ৮৭ লাখ ৫৮ হাজার ৮২০ টাকা কেটে রেখে প্রতিষ্ঠানটি বিসিবিকে দিয়েছে মাত্র ১১ কোটি ৮ লাখ ৫৭ হাজার ৬৬৭ টাকা! চুক্তি থাকাকালে নিমবাসের উপর কঠোর হতে পারেনি বিসিবি। করেনি প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা। অথচ প্রতিষ্ঠানটি দেউলিয়া ঘোষিত হবার পর সিঙ্গাপুরে আরবিট্রেশন (সালিশ) মামলা করেও টাকা উদ্ধার করতে পারেনি বিসিবি।

২০১৫ সালের ৩ নভেম্বর সিঙ্গাপুরের স্ট্রেইট ল’প্র্যাকটিস এলএলসি কোম্পানিকে আরবিট্রেশন প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব দিয়ে হতাশ হতে হয়েছে বিসিবি। এই মামলা চালিয়ে টাকা উদ্ধারের সম্ভাবনা নেই, তা ২০১৬ সালের ১৮ জানুয়ারি সিঙ্গাপুরভিত্তিক আইনি প্রতিষ্ঠানটি জানিয়ে দেয়ার পরও টাকা উদ্ধার তৎপরতা থেমে নেই বিসিবির। সুযোগ বুঝে পরবর্তীতে ২ লাখ ডলার (১ কোটি ৬০ লাখ টাকা)  লিগ্যাল ফি ওই আইনি প্রতিষ্ঠান দাবি করায়  বিসিবির লিগ্যাল অ্যাডভাইজারদের মাধ্যমে আরবিট্রেশন মামলা পরিচালনায় সিঙ্গাপুরভিত্তিক অন্য কোন আইনী প্রতিষ্ঠানের সহায়তা চেয়েছে। সুরাহার সম্ভাবনা নেই, তা জেনেও এই আইনী লড়াইয়ে বছরের পর বছর মোটা অঙ্ক খরচ করে চলেছে বিসিবি।

প্রতি বছরই অপরিবর্তিত আছে অবচয়ের খাত। অডিট রিপোর্ট বলছে, গত ৭ অর্থ বছরে অবচয়ের অংকের সমস্টি ২১ কোটি ৬০ লাখ ৯৫ হাজার ১৫৪ টাকা। পরিচালকদের হাত দিয়ে ব্যয় হওয়া অর্থের মধ্যে ২৭ কোটি ৯৬ লাখ ৫১ হাজার ৭৮৯ টাকার ব্যাখ্যা নেই অডিট রিপোর্টে। ফলে গত ৭ অর্থ বছরে উদ্বৃত্ত অর্থের পরিমাণ নিয়ে সন্তুষ্ট হওয়ার উপায় নেই।  

নিমবাসের কাছে পাওনা ৯১ কোটি ৫৪ লাখ ৪৬ হাজার ২২০ টাকা পাওয়ার আশা তো ছেড়েই দিয়েছে বিসিবি, তার উপর  বিপিএলএ ফ্রাঞ্চাইসিদের বকেয়া রাখা প্লেয়ার্স পেমেন্ট খাতের ২৭ কোটি ৪৬ লাখ ৩৩ হাজার ৮৬৮ টাকা তহবিল থেকে দিতে হয়েছে বিসিবিকে!  তৃতীয় আসরে এসে গেম অন স্পোর্টস ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে চুক্তি বাতিল না করলে এই পরিমাণ অর্থ যে ভর্তুকি দিতে হতো না বিসিবিকে। এর সঙ্গে ছোট খাট আরো কিছু খাত মিলিয়ে ১৪৬ কোটি ৪৭ লাখ ১৩ হাজার ৯৫৪ টাকা পাওয়ার সম্ভাবনা নেই, তা ধরেই নিয়েছে বিসিবি। অংকটা বাড়তে পারে আরো।

২০১১ বিশ্বকাপের বার্তা পৌঁছে দিতে উন্মুক্ত কনসার্ট আয়োজনে এটিএন রেকর্ডসকে অনুমতি দিয়ে ৫ কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্যপূরণ হয়নি বিসিবির। এটিএন রেকর্ডসের কনসার্ট আয়োজনে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের অ্যাথলেটিক্স ট্র্যাক হয়েছে ক্ষতিগ্রস্থ। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের দাবি করা সেই ক্ষতিপূরণ উল্টো দিতে হয়েছে বিসিবিকে।

২০১৫-১৬ অর্থ বছরে বিসিবি এটিএন রেকর্ডসের কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা উদ্ধার করলেও ৩ কোটি ১৭ লাখ টাকা এখনো পরিশোধ করেনি ওই প্রতিষ্ঠানটি! এ টাকা উদ্ধারের তেমন কোন সম্ভাবনা দেখছে না বিসিবি।

অর্থনীতির ভাষায় ‘ব্যাড ডেট’ এক্সপেন্স খাতটা তাই ২০১৪-১৫ অর্থ বছর থেকে অডিট রিপোর্টে যুক্ত করতে হয়েছে বিসিবিকে। নিরুপায় হয়ে ১৪৬ কোটি ৪৭ লাখ ১৩ হাজার ৯৫৪ টাকা পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়েছে বিসিবি।  

অডিট রিপোর্ট পর্যালোচনায় তা মনে করছেন বিসিবির অর্থ কমিটির চেয়ারম্যান আফজালুর রহমান সিনহাও। তিনি বলেন, ‘মনে হচ্ছে এই খাতগুলোতে থাকায় অনাদায়ী টাকা আদায় করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।’      

এসআই/জেডসি