ঢাকা: ২০১৮-০৬-২৪ ১:১৮

Khan Brothers Group

স্বাগত হে মাহে রমাদান

প্রকৌশলী মামুন আহম্মেদ

এশিয়ানমেইল২৪.কম

প্রকাশিত : ০৪:২৪ পিএম, ১৭ মে ২০১৮ বৃহস্পতিবার | আপডেট: ১১:৪৩ এএম, ১৮ মে ২০১৮ শুক্রবার


বাড়িতে বিশেষ কোনো বিশেষ মেহমান আসার তারিখ থাকলে আমরা পূর্ব থেকেই নানা প্রস্তুতি নেই। ঘরদোর পরিষ্কার করি। বিছানাপত্র সাফ-সুতরো করি। পরিপাটি করি বাড়ির পরিবেশ। নিশ্চিত করি মেহমানের যথাযথ সম্মান ও সন্তুষ্টি রক্ষার সার্বিক ব্যবস্থা। তারপর অপেক্ষা করতে থাকি মেহমানকে সসম্মানে বরণ করে নেবার জন্য। আমাদের দুয়ারেও আজ কড়া নাড়ছে এক বিশেষ অতিথি। এমন অতিথি যার আগমনে সাড়া পড়ে যায় যমীনে ও আসমানে! আনন্দের হিল্লোল বয়ে যায় সমগ্র সৃষ্টি জগতে! আল্লাহর হাবীবের মুখেই শুনুন সে কথা-

‘যখন রমজানের প্রথম রাত্রি আগমন করে শয়তান এবং অবাধ্য জিনদের শৃঙ্খলিত করা হয়, জাহান্নামের সকল দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়; খোলা রাখা হয় না কোন দ্বার, জান্নাতের দুয়ারগুলো অর্গলমুক্ত করে দেয়া হয়; বদ্ধ রাখা হয় না কোন তোরণ। এদিকে একজন ঘোষক ঘোষণা করেন,‘হে পুণ্যের অনুগামী, অগ্রসর হও। হে মন্দ-পথযাত্রী থেমে যাও’। আবার অনেক ব্যক্তিকে আল্লাহ তা‘আলা জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। আর এমনটি করা হয় রমজানের প্রতি রাতেই’।

- তিরমীযী : ৬৮২; ইবনমাজা : ১৬৪২; ইবনহিব্বান : ৩৪৩৫ সহীহুত-তিরমিযীতে

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাই রমজান আসার পূর্ব থেকেই রমজানের জন্য প্রস্তুতি নিতেন। শাবান মাসে অধিক হারে নফল রোজা পালনের মাধ্যমে তিনি রমজানে সিয়াম সাধনার আগাম প্রস্তুতি নিতেন। পূর্বানুশীলন করতেন। তদুপরি তিনি সাহাবীদেরকে রমজানের শুভাগমনের সুসংবাদ দিতেন। তাদেরকে শোনাতেন রমজানের ফযীলতের কথা। তারা যেন রমজানে ইবাদত-বন্দেগীতে বেশি করে আত্মনিয়োগ করতে পারেন। নেকী অর্জনে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে প্রত্যয়ী হন।

আবূ হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সঙ্গী-সাথীদের এ মর্মে সুসংবাদ শোনাতেন, ‘তোমাদের সমীপে রমজান মাস এসেছে। এটি এক মোবারক মাস। আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের ওপর এ মাসের রোজা ফরজ করেছেন। এতে জান্নাতের দ্বার খোলা হয়। বন্ধ রাখা হয় জাহান্নামের দরজা। শয়তানকে বাঁধা হয় শেকলে। এ মাসে একটি রজনী রয়েছে যা সহস্র মাস হতে উত্তম। যে এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হল সে যেন যাবতীয় কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত হল’।

- নাসায়ী : ২৪২৭; মুসনাদ আহমাদ : ৮৯৭৯; শুআবুল ঈমান : ৩৩২৪

সুতরাং আমাদের কর্তব্য হল, এ মাস আসার আগেই এর যথার্থ মূল্যায়নের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা। নীরবে এসে নীরবে চলে যাওয়ার আগেই এ মহান অতিথির যথাযথ সমাদর করা। এ মাস যেন আমাদের বিপক্ষে দলীল না হয়ে দাঁড়ায় সে জন্য প্রস্তুতি সম্পন্ন করা। কারণ মাসটি পেয়েও যে এর উপযুক্ত মূল্য দিল না, বেশি বেশি পুণ্য আহরণ করতে পারল না এবং জান্নাত লাভ ও জাহান্নাম থেকে পরিত্রাণের পরোয়ানা পেল না, সে বড় হতভাগ্য।

সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো এমন ব্যক্তি আল্লাহর ফেরেশতা ও খোদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বদ দোয়ার অধিকারী। কারণ এমন ব্যক্তির ওপর জিবরীল আলাইহিস সালাম লানত করেছেন আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সঙ্গে ‘আমীন’ বলেছেন!

কেননা হাদীসে এসেছে, আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদা মিম্বরে আরোহণ করলেন। অতপর বললেন, আমীন, আমীন আমীন। জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল, এটা আপনি কী করলেন? তিনি বললেন, জিবরীল আমাকে বললেন, ওই ব্যক্তির নাক ধূলিধুসরিত হোক যার সামনে রমজান প্রবেশ করলো অথচ তাকে ক্ষমা করা হলো না। আমি শুনে বললাম, আমীন (আল্লাহ কবূল করুন)। এরপর তিনি বললেন, ওই ব্যক্তির নাক ধূলিধুসরিত হোক যার সামনে আপনার কথা আলোচিত হয় তথাপি সে আপনার ওপর দরূদ পড়ে না। তখন আমি বললাম, আমীন (আল্লাহ কবূল করুন)। অতপর তিনি বললেন, ওই ব্যক্তির নাক ধূলিধুসরিত হোক যে তার পিতামাতা বা তাদের একজনকে পেল অথচ সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারলো না। তখন আমি বললাম, আমীন (আল্লাহ কবূল করুন)।

- বুখারী, আল-আদাবুল মুফরাদ : ৬৪৬; সহীহ ইবন খুযাইমাহ : ১৮৮৮; বাইহাকী : ৮২৮৭।

রমজানকে স্বাগত জানানোর ক্ষেত্রে সুন্নত হল, রমজানের চাঁদ দেখে নিম্নের দোয়াটি পাঠ করা। আবদুল্লাহ ইবন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন চাঁদ দেখতেন, তখন তিনি বলতেন, হে আল্লাহ আপনি একে আমাদের ওপর বরকত ও ঈমানের সঙ্গে এবং সুস্থতা ও ইসলামের সঙ্গে উদিত করুন, তোমার এবং আমার রব হলেন আল্লাহ ।

- তিরমিযী : ৩৪৫১, মুসনাদ আহমদ : ১৩৯৭। সহীহ ইবন হিব্বান : ৮৮৮।

অতপর একে স্বাগত জানানোর সর্বোত্তম উপায়, রমজানকে সকল গুনাহ থেকে বিশেষ তাওবার সঙ্গে গ্রহণ করা। কারণ এটাতো তাওবারই মৌসুম। এ মাসে তাওবা না করলে তাওবা করবে কবে? অনুরূপভাবে রমজানকে স্বাগত জানানো ইবাদাতে দ্বিগুণ চেষ্টা, দান সদকা, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির-ইস্তেগফার এবং অন্যান্য নেক আমল অধিক পরিমাণে করার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে। এবং এ দোয়ার মাধ্যমে- হে আল্লাহ, আমাদেরকে তোমার সন্তুষ্টি মত রোজা রাখার এবং তারাবীহ আদায় করার তাওফীক দাও।

তাই আসুন আমরা এ মহান অতিথিকে বরণ করে নিয়ে এ মাসের দিন-রাত্রিগুলো এমন আমলের মধ্য দিয়ে কাটানোর প্রস্তুতি নেই যা আমাদেরকে আল্লাহ তা‘আলার প্রিয় করে তুলবে। আমরা যেন সেসব লোকের দলে অন্তর্ভুক্ত না হই যারা রসনা তৃপ্তির রকমারি আয়োজন ও সালাত বরবাদ করার মাধ্যমে রমজানকে স্বাগত জানায়। আমরা যেন সেই লোকদের অন্তর্ভুক্ত না হই যারা রমজান পাওয়ার পরও আল্লাহর কাছে মাগফিরাত না পেয়ে নিজেকে আল্লাহর ফেরশতা ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বদ দোয়ার যোগ্য বানায়। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের কবুল করুন। আমীন।